31/01/2024
কি ব্যাবহার করছেন আপনার মূল্যবান দেহে একবার ভেবে দেখেছেন?
পুরান ঢাকায় দেশি-বিদেশি নামিদামি ব্র্যান্ডের সব ধরনের নকল প্রসাধনী তৈরি হচ্ছে। এসব প্রসাধনীতে ব্যবহার হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতিকর রাসায়নিক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব প্রসাধনী নিয়মিত ব্যবহারে ত্বকের মারাত্মক ক্ষতিসহ ক্যানসারেরও ঝুঁকি রয়েছে। এমনকি দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে এসব প্রসাধনী মৃত্যুর কারণও হতে পারে। দামে কিছুটা সস্তা হওয়ায় সেগুলো দেদার কিনছে সাধারণ মানুষ। নকল ধরতে না পারায় বিত্তশালীরাও এগুলো কিনছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে প্রসাধনীর (ক্রিম, শ্যাম্পু, সাবান, লোশন, আফটার শেভ লোশন, পারফিউম এসব) যে চাহিদা রয়েছে, তার ১৫ শতাংশ জোগান দিচ্ছে অনুমোদিত দেশীয় কোম্পানি। ১৫ শতাংশ আমদানি করা পণ্য। বাকি ৭০ শতাংশ প্রসাধনী নকল ও ক্ষতিকারক উপাদান দিয়ে তৈরি হচ্ছে, যার মূল কেন্দ্র পুরান ঢাকা।
এ বিষয়ে ওই বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু সারা শামসুর রউফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভেজাল প্রসাধনীগুলো মারাত্মক ক্ষতিকারক উপাদানে তৈরি হয়, যা ব্যবহারে ত্বক পুড়ে (বার্ন) যায়। চামড়া ড্যামেজ হয়ে পড়ে। বিভিন্ন ধরনের অ্যালার্জি হয়। এমনকি চেহারা বিকৃত হয়ে যেতে পারে। এসব প্রসাধনীতে হেভি মেটাল থাকলে তা কিডনি ড্যামেজ করে ফেলতে পারে। এমনকি এসব পণ্য ব্যবহারে পুরনো রোগগুলো নতুন করে দেখা দিতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্বমানের ব্র্যান্ড গার্নিয়ার, লরেল, রেভলন, হেড অ্যান্ড শোল্ডার, লাক্স লোশন, মাস্ক লোশন, অ্যাকুয়া মেরিন লোশন, পেনটিন, নিভিয়া লোশন, ফেড আউট ক্রিম, ডাভ সাবান, ইমপেরিয়াল সাবান, সুগন্ধির মধ্যে হুগো, ফেরারি, পয়জন, রয়েল, হ্যাভক ও কোবরা, অলিভ অয়েল, কিওকারপিন, আমলা, আফটার সেভ লোশন, জনসন, ভ্যাসেলিন হেয়ার টনিক, জিলেট ফোম, প্যানটিন প্রো-ভি ও হারবাল এসেনশিয়াল লোশনের নামে ভেজাল প্রসাধনী বিক্রি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
এসব প্রসাধনীতে ১৩ ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে প্যারাবেন (মিথাইল প্যারাবেন, বিউটেল প্যারাবেন, প্রপেল প্যারাবেন, ইসোবিউটেল প্যারাবেন, ইথাইল প্যারাবেন ইত্যাদি নামে পাওয়া যায় এই রাসায়নিক), ডাই ইথানল এমিন (ডিইএ), বিএইচএ (বিউটিলেটেড হাইড্রক্সি এনিসল) ওবিএইচটি (বিউটিলেটেড হাইড্রক্সি টলুইন), পলি ইথিলিন গ্লাইকল (পিইজি), সোডিয়াম লিউরেল সালফেট এবং সোডিয়াম লিউরেথ সালফেট উল্লেখযোগ্য।
এসব ক্ষতিকর রাসায়নিক বিভিন্ন ধরনের মেকআপ, ময়েশ্চারাইজার, সাবান, শ্যাম্পু, ফেসপাউডার, লিপস্টিক, নেইলপলিশ, ক্রিম, সেভিং ফোম, মেকআপ, চুলের রং, কন্ডিশনার, লোশন, বেবি লোশন, সাবান ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।
এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, বিভিন্ন প্রসাধন, ডিউডোরেন্ট, বডি স্প্রে এবং পারফিউম উৎপাদনে প্রায় তিন হাজার রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এসব রাসায়নিক উপাদানগুলো অ্যালার্জি, মাইগ্রেইনস এবং হাঁপানি সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া ত্বকে চুলকানি, চোখ জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে। এর অধিক ব্যবহারে চোখের ক্ষতি, বিষণতা, শ্বাসনালির ক্ষতি, ডায়রিয়া এবং তীব্র চামড়া জ্বালা হতে পারে। ইমিউন সিস্টেমের ক্ষতি করতে পারে। যা পরবর্তী সময়ে হার্ট, লিভার, ফুসফুস ও মস্তিষ্কের দারুণ ক্ষতি করে।
ক্ষতিকর রাসায়নিক দিয়ে তৈরি মানহীন প্রসাধনী ব্যবহারে শুধু ক্যানসার হতে পারে তা নয়; এসব থেকে স্নায়ুবিক দুর্বলতা ও কিডনি বিকল হতে পারে বললেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চর্মরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. রাশিদুল হাসান। তিনি বলেন, ভেজাল ও মানহীন প্রসাধনীর অ্যালার্জিক রিয়াকশনে রোগী মারাও যেতে পারেন। দীর্ঘদিন এসব ব্যবহারে ত্বকের পাশাপাশি কিডনি এবং শরীরে অন্যান্য অংশেও মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। আমরা যেসব রোগী প্রতিদিন পাই তাদের মুখে কালো দাগ, র্যাশ, গোটা, লালা হয়ে যাওয়া, অ্যালার্জি, অত্যধিক ঘাম ঝরে। এ সময় রোগীরা কিছু ক্রিম, লোশনের কথা বলেন। আমরা সেগুলো পরীক্ষা করে দেখেছি মারাত্মক ক্ষতিকর উপাদান থাকে। তবে রোগীদের পক্ষে জানা সম্ভব নয় তারা কী ব্যবহার করছেন।
কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক গোলাম রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রসাধনসামগ্রীতে ভেজালের সঙ্গে জড়িতদের বিএসটিআইয়ের আইন অনুযায়ী মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও বাস্তবে প্রয়োগ নেই। এমনকি পুলিশ বিভিন্ন অভিযান চালালেও পুরান ঢাকার এসব নকল কারখানায় কখনো ঠিকমতো অভিযান চালায় না। এসব নকল প্রসাধনী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, মান নিয়ন্ত্রণকারী কর্র্তৃপক্ষের সার্টিফিকেট ও বিএসটিআই কর্র্তৃক বাজারজাতকরণের ছাড়পত্র নেই। সস্তায় এসব নকল প্রসাধনী কিনে সাধারণ মানুষ যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; তেমনি নানা ধরনের রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে।