19/05/2026
রোগীদের অল্পস্বল্প গল্প
এক অসামান্য সন্তানের গল্প — “পুতুল”
ডাক্তারি জীবনে অসংখ্য রোগী দেখি, অসংখ্য মুখ আসে-যায়। কিন্তু কিছু মানুষ থেকে যায় হৃদয়ের খুব গভীরে। আজ আমি এমনই এক অসামান্য সন্তানের এবং তার সংগ্রামী মায়ের গল্প শেয়ার করতে চাই।
তাকে আমি প্রথমে চিনতাম শুধু “পুতুল” নামে। তখনও জানতাম না তিনি দেশের একজন খ্যাতিমান অভিনেত্রী, বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০২৩-এর শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী, প্রথম আলো মেরিল শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীসহ বহু সম্মাননার অধিকারী। আমার কাছে তিনি শুধু একজন মেয়ে, যে তার মায়ের জন্য অসম্ভব রকমের যুদ্ধ করে যাচ্ছে।
প্রায় তিন বছর আগে, একদিন রাত বারোটার পরে তিনি তার মাকে নিয়ে আমার চেম্বারে আসেন। পরে জেনেছিলাম, তিনি অনেকক্ষণ ধরেই অপেক্ষা করছিলেন। তার মা নুরুন নাহার—অসাধারণ প্রাণবন্ত একজন মানুষ। প্রথম দেখাতেই তাকে ভালো লেগে গিয়েছিল। সেদিন থেকেই যেন শুরু হয় আমাদের দীর্ঘ পথচলা।
তখন তার মা ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD) এবং হাইপারপ্যারাথাইরয়েডিজমে ভুগছিলেন। সার্জারির প্রয়োজন ছিল, কিন্তু শারীরিক অবস্থা তা অনুমতি দিচ্ছিল না। ধীরে ধীরে কিডনির অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে। একসময় ডায়ালাইসিস শুরু করতে হয়।
এরপর শুরু হয় এক কঠিন অধ্যায়।
তিনি পপুলার হাসপাতালের ICU-তে প্রায় ১৫–২০ দিন সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায় ভর্তি ছিলেন। মেডিকেল বোর্ড বসেছে, দেশের অনেক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তাকে দেখেছেন। কিন্তু কোনোভাবেই জ্ঞান ফিরছিল না। অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে সবাই প্রায় আশা হারিয়ে ফেলছিল।
পরে অনেক বেশি খরচ হয়ে যাওয়ায় তাকে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। সেখানে রিক্সবন্ডের একটি কেবিনে রেখে চিকিৎসা চলতে থাকে। দিন যায়, রাত যায়—কিন্তু প্রায় ২৪ দিন পর্যন্ত কোনো জ্ঞান ফেরেনি।
এর মাঝেই আসে ৫ আগস্ট ২০২৪।
সেদিন বিকালে হঠাৎ তিনি প্রথম চোখ খুললেন।
আজও সেই মুহূর্তটা মনে পড়ে। আমরা সবাই যেন নতুন জীবন ফিরে পেলাম। সেই ঘটনাকে ঘিরে তখন অনেক হাসাহাসিও করেছিলাম।
কিন্তু পুতুলের সংগ্রাম তখনও শেষ হয়নি।
কিছুদিন পরপরই মাকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হতো। এর মধ্যেই পুতুল নিজে গর্ভবতী হন। আর ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস—যখন তার ডেলিভারির সময় ঘনিয়ে আসে, তখন তার মা আবার গুরুতর অসুস্থ।
মাকে দেখার মতো পৃথিবীতে আর কেউ ছিল না।
আমি নিজের চোখে দেখেছি—একজন মেয়ে কীভাবে একই সময়ে নিজের গর্ভাবস্থা, অসুস্থ মা এবং সংসার সামলাচ্ছে। সে নিজে এক কেবিনে ভর্তি, পাশের কেবিনে ভর্তি তার মা। দুই কেবিনের মাঝের বারান্দা দিয়ে তার স্বামী ছুটে বেড়াচ্ছেন—কখনো স্ত্রীর কাছে, কখনো শাশুড়ির কাছে।
পুতুলের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার স্বামী—অসাধারণ সহনশীল এবং নিবেদিত একজন মানুষ।
একজন সন্তান হিসেবে পুতুল তার মায়ের জন্য যে পরিশ্রম করেছে—শারীরিক, মানসিক, আর্থিক—তা আমার পুরো ক্যারিয়ারে খুব কম মানুষের মধ্যে দেখেছি।
ধীরে ধীরে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়। সন্তান সুস্থভাবে পৃথিবীতে আসে। মা-ও কিছুটা ভালো থাকেন। তারা বাসায় ফিরে যান এবং নিয়মিত ডায়ালাইসিস চলতে থাকে।
কিন্তু নতুন করে শুরু হয় আরেক যুদ্ধ।
বারবার vascular access failure হতে থাকে। ডায়ালাইসিসের জন্য কোনো fistula বা catheter দীর্ঘদিন কাজ করছিল না।
এই পর্যায়ে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হন আমার অত্যন্ত কাছের ছোট ভাই, বাংলাদেশের অন্যতম সেরা vascular surgeon ডা. শাহিন এবং তার দল।
শুরু হয় এক নতুন সংগ্রাম।
বছরের পর বছর ডায়ালাইসিসের জন্য একের পর এক vascular access তৈরি করতে হয়েছে—ডান পাশের IJV catheter, একাধিক femoral catheter, ব্যর্থ RC fistula, এরপর Left B-C fistula, এমনকি দীর্ঘ ১.৫ বছর Left IJV permacath-এর ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
পরবর্তীতে গভীরে থাকা fistula vein ব্যবহারযোগ্য করতে Left arm cephalic vein superficialization করা হয়। দুই সপ্তাহ পর সেই fistula দিয়ে আবার dialysis শুরু হয়।
কিন্তু হঠাৎ নতুন সমস্যা দেখা দিল।
ধীরে ধীরে মুখমণ্ডল ও দুই হাত ফুলে যেতে লাগল। গলার শিরাগুলো অস্বাভাবিকভাবে ফুলে উঠতে শুরু করল। অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছিল।
কারণ খুঁজতে করা হলো central venogram।
সেখানে ধরা পড়ল এক ভয়াবহ সত্য—তার Superior Vena Cava (SVC) সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে, অর্থাৎ 100% chronic total occlusion।
এটি ছিল অত্যন্ত জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি।
ডা. শাহিন ও তার দল ধাপে ধাপে challenging percutaneous intervention এবং balloon venoplasty করেন। কিন্তু পর্যাপ্ত রক্তপ্রবাহ ফিরছিল না। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় SVC stenting-এর।
সফলভাবে ১৪×৬০ মিমি self-expanding stent বসানো হয়।
আর তারপর যেন অলৌকিক পরিবর্তন।
মাত্র এক দিনের মধ্যেই মুখ ও দুই হাতের ফোলা নাটকীয়ভাবে কমে যায়। মনে হচ্ছিল, তিনি যেন নতুন জীবন ফিরে পেলেন।
এই পুরো সময়টাতে পুতুল প্রায়ই আমার দিকে তাকিয়ে বলত,
“স্যার, আমার কি আর কখনোই সংগ্রাম শেষ হবে না?”
আমি তাকে একটাই কথা বলতাম—
“আপনি এতগুলো সংগ্রাম পার করে এসেছেন। এবারও সফল হবেন, ইনশাআল্লাহ।”
আজও সেই সংগ্রাম চলছে। কিন্তু পুতুলের ধৈর্য, তার মায়ের প্রতি ভালোবাসা, আর তার স্বামীর নিরব সমর্থন—এই তিনটি জিনিস আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।
মজার বিষয় হলো, এতদিন আমি জানতামই না তিনি এত বড় একজন অভিনেত্রী। তার অভিনীত নাটক বা চলচ্চিত্রও আমার দেখা হয়নি। কিন্তু আমি যেটা দেখেছি, সেটা হয়তো যেকোনো পুরস্কারের চেয়েও বড়—
একজন মায়ের প্রতি সন্তানের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
যখন দেখলাম তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে সম্মানিত হয়েছেন, তখন আমি তাকে বলেছিলাম—
“দেখেন, আপনি দুনিয়াতেই সম্মান পেয়ে গেছেন।”
আমি দোয়া করি, আল্লাহ যেন পুতুলকে তার মা, সন্তান এবং পরিবারকে নিয়ে সুস্থ ও সুন্দর জীবন দান করেন। জীবনে আরও অনেক সাফল্য দান করেন।
আর সবচেয়ে বড় কথা—তার মায়ের খেদমতের এই অসাধারণ প্রতিদান যেন আল্লাহ আখেরাতে উত্তমভাবে কবুল করেন। তাকে উত্তম প্রতিদান দান করেন এবং সেই অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দান করেন।
আমিন।
—
ডা. রেজওয়ানুর রহমান
MBBS, MD (Nephrology), FRCP (Edin)
Professor & Head, Department of Nephrology
Bangladesh Medical College Hospital
Consultant Nephrologist
Popular Medical College Hospital, Dhanmondi