22/09/2026
আলঝাইমার শুধু বয়সের কারণে স্মৃতি কমে যাওয়া নয়। এটি মস্তিষ্কের জটিল একটি রোগ, যেখানে বয়স ও জেনেটিক ঝুঁকির পাশাপাশি হার্টের স্বাস্থ্য, রক্তনালী, বিপাকীয় স্বাস্থ্য, জীবনযাপনেরও ভূমিকা রয়েছে। আর কোনো বিশেষ খাবার নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই মস্তিষ্কের এই সমস্যার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ২১ নভেম্বর ছিলো বিশ্ব আলঝাইমার দিবস।
আলঝাইমার (Alzheimer’s disease), মস্তিষ্কের একটি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ। যার শুরুতে স্মৃতি ও শেখার ক্ষমতা কমে এবং পরে চিন্তা, ভাষা, সিদ্ধান্ত নেওয়া ও দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
একক কোনো কারণে আলঝাইমার হয় না। মস্তিষ্কে কয়েকটি পরিবর্তন একসঙ্গে ঘটতে ঘটতে হয়ে। যেমন:
- মস্তিষ্কের কোষের বাইরে কিছু অস্বাভাবিক প্রোটিন জমা হতে পারে।
- নিউরনের ভেতরে tau প্রোটিন অস্বাভাবিকভাবে পরিবর্তিত হয়ে জট তৈরি করতে পারে।
- দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ মস্তিষ্কের কোষের ক্ষতিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
- নিউরনের মধ্যে যোগাযোগ দুর্বল হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত কিছু নিউরন মারা যায়।
- সময়ের সঙ্গে মস্তিষ্কের কিছু অংশ সঙ্কুচিত (atrophy) হতে পারে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—amyloid বা tau জমাট দেখা গেলেই যে আলঝাইমার হবেই, তা নয়। রোগটি অনেকগুলো জৈবিক ও জেনেটিক কারণের একত্রিত ফল।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকির একটি হলো মানুষের বয়স। বিশেষ করে ৬৫ বছরের পর ঝুঁকি বাড়ে। তবে এটি শুধু বয়স্কদের রোগ নয়, অনেকসময় কম বয়সেও early-onset Alzheimer’s-ও হতে পারে।
এর ঝুঁকি বাড়ার কয়েকটি মাধ্যম রয়েছে। যেমন: পারিবারিক ইতিহাস ও কিছু genetic factor-যেমন APOE ε4, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, LDL এর মাত্র বেশি/ রক্তের অস্বাভাবিক চর্বি, স্থূলতা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপান. অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ, দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা, শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া, সামাজিক বিভিন্ন কারণে বিচ্ছিন্নতা/দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতার মতো কিছু বিষয়, মাথায় গুরুতর আঘাতে আলঝাইমারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তবে ঝুঁকি থাকা মানেই রোগ হবেই, এমনটা নয়।
পরিবারের কেউ এই সমস্যায় থাকলে তাদের খাবারের বা পুষ্টির বিষয়ে অনেকেই আমাদের জিজ্ঞেস করে। মনে রাখবেন, খাবার থেকে যেমন আলঝাইমার হচ্ছে না, ঠিক তেমনি কোনো নির্দিষ্ট খাবার দিয়ে আলঝাইমার সারানো যায় না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যাভ্যাস মস্তিষ্ক ও রক্তনালীর স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। গবেষণায় সবচেয়ে বেশি Mediterranean বা MIND খাদ্যাভ্যাস প্রমোট করা হয়। এই ডায়েটের ধরণ অনেকটা- প্রচুর শাকসবজি খাওয়া, বিভিন্ন মৌসুমি ফল ও বিভিন্ন বেরিজাত ফল, ডাল, beans ও অন্যান্য legumes, গোটা শস্য, বাদাম ও বীজ, মাছ, স্বাস্থ্যকর চর্বি, পর্যাপ্ত চর্বিছাড়া প্রোটিন জাতিয় খাবারগুলো প্রাধান্য দেয়া।
এক্ষেত্রে আবার কিছু কিছু খাবার কমানোর প্রয়োজন হয়। যেমন: অতিরিক্ত চিনি ও মিষ্টি পানীয়, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাতকৃত খাবার, অতিরিক্ত লবণ, সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবার, অতিরিক্ত ক্যালরিবহুল খাবার।
এই ধরনের খাদ্যাভ্যাস হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালীর স্বাস্থ্য ঠিক রাখে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত থাকে। রক্তে শর্করা এবং প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। এই সমস্যাগুলোর সবগুলোই মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এর পাশাপাশি কিছু কিছু ভিটামিন আলঝাইমারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ যে ভিটামিনগুলোর ঘাটতি থাকলে তা পূরণ করা জরুরি। যেমন: ভিটামিন বি১২, ফোলেট, ভিটামিন ডি-র ঘাটতি থাকলে তা পূরণ করা প্রয়োজন। তবে ঘাটতি না থাকলেও যদি খাওয়া হয় তাহলে আলঝাইমার প্রতিরোধ হয় তা নয়।
আমরা সবাই জানি, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। সেজন্য চেষ্টা করা উচিত আলঝাইমারের প্রতিরোধের। তবে এটা বলা যায় না যে, প্রতিরোধ পুরিপুরি সম্ভব। ফুডহ্যাবিট ও লাইফস্টাইলের কিছু বিষয়ে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। যেমন:
• নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করা, অর্থাৎ সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার এক্সারসাইসের লক্ষ্য স্থির করা।
• রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
• ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা।
• ধূমপান থেকে বিরত থাকা।
• স্বাস্থ্যকর ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস।
• পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম।
• শ্রবণশক্তি কমলে পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় hearing support নেওয়া।
• সামাজিক ও মানসিকভাবে সক্রিয় থাকা—পড়া, শেখা, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো, নতুন দক্ষতা অর্জন করা।
• মাথার যেকোনো আঘাত এড়ানো।
• অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ এড়িয়ে চলা।
প্রতিকারে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন।