19/08/2026
আল্লাহ কখনো তাঁর মুমিন বান্দাকে একা ছেড়ে দেন না। কখনো তিনি বিপদ দূর করে দেন, কখনো বিপদের মধ্যেই বান্দাকে সাহায্য করেন, আবার কখনো দেরি করেন বান্দার ঈমান, সবর ও তাওয়াক্কুলকে পরিপক্ব করার জন্য। কারণ আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে, কীভাবে আসবে এবং কোন পথে আসবে, তা আমাদের নয়, তাঁর হিকমতের বিষয়।
আল্লাহ বলেন:
“যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে রিজিক দেন এমন জায়গা থেকে, যা সে কল্পনাও করে না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।”
[আল কুরআন, সূরা আত-তালাক, ৬৫/২–৩]
তাই বিপদে পড়ে আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, আল্লাহ কীভাবে সমস্যার সমাধান করবেন তা আমরা দেখতে না পেয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। অথচ ঈমানের দাবি হলো, সমাধানের পথ চোখে না দেখলেও সমাধানকারীর ওপর আস্থা রাখা।
আল্লাহ বলেন:
“যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট।”[আল কুরআন, সূরা আত-তালাক, ৬৫/৩]
মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর সামনে যখন সমুদ্র, পেছনে ফেরাউনের বাহিনী, তখন তাঁর সঙ্গীরা বলেছিল:
“আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম!”
মূসা (আলাইহিস সালাম) বলেছিলেন:
“কখনোই নয়! নিশ্চয়ই আমার রব আমার সঙ্গে আছেন, তিনি আমাকে পথ দেখাবেন।”
[আল কুরআন, সূরা আশ-শু‘আরা, ২৬/৬১–৬২]
এটাই তাওয়াক্কুল। পরিস্থিতি ভয়াবহ হলেও আল্লাহর ব্যাপারে হৃদয়ে সন্দেহ না রাখা।
তাহলে আল্লাহ সঙ্গে সঙ্গে সব ঠিক করে দেন না কেন?
কারণ দুনিয়া পরীক্ষার জায়গা।
আল্লাহ বলেন:
“আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে। আর আপনি সুসংবাদ দিন সবরকারীদের।”
[আল কুরআন, সূরা আল-বাকারা, ২/১৫৫]
আর রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“সবচেয়ে বেশি পরীক্ষিত হন নবীগণ, তারপর যারা তাদের নিকটবর্তী।”
[আল হাদীস, জামে‘ আত-তিরমিজি, হা/২৩৯৮]
অতএব বিপদ আসা মানেই আল্লাহ আপনাকে ছেড়ে দিয়েছেন, এমন নয়। বরং কখনো কখনো বিপদই আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার ঈমান ও মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যম হয়ে আসে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“মুমিনের ব্যাপারটি আশ্চর্যজনক! তার সব অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর… সুখ পেলে সে শুকরিয়া করে, তা তার জন্য কল্যাণকর; আর বিপদে পড়লে সে সবর করে, সেটিও তার জন্য কল্যাণকর।”
[আল হাদীস, সহিহ মুসলিম, হা/২৯৯৯]
সাহায্য কখনো দেরি হয়, কিন্তু আল্লাহর সিদ্ধান্তে ভুল হয় না
কখনো পরীক্ষা এত দীর্ঘ হয় যে মনে হয়, “আর কত?” কিন্তু মুমিনের দায়িত্ব হলো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া।
আল্লাহ বলেন:
“নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত থেকে কাফির সম্প্রদায় ছাড়া কেউ নিরাশ হয় না।”
[আল কুরআন, সূরা ইউসুফ, ১২/৮৭]
এমনকি যখন বিপদ চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখনই আল্লাহর সাহায্য সবচেয়ে কাছাকাছি হতে পারে। আল্লাহ বলেন:
“তারা বিপর্যস্ত ও কষ্টগ্রস্ত হয়েছিল এবং এমনভাবে প্রকম্পিত হয়েছিল যে, এমনকি রাসূল ও তাঁর সঙ্গে মুমিনরা বলে উঠেছিল, ‘আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে?’ জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী।”
[আল কুরআন, সূরা আল-বাকারা, ২/২১৪]
সুতরাং অনিশ্চয়তা যত বাড়ে, মুমিনের তাওয়াক্কুল তত গভীর হতে পারে। কারণ তখন সে নিজের শক্তি, পরিকল্পনা ও সামর্থ্যের ওপর নয়, আল্লাহর ওপর নির্ভর করতে শেখে।
পরীক্ষার পর যে অর্জন, তা অনেক সময় বিপদের চেয়েও মূল্যবান
একজন বান্দা যখন দীর্ঘ পরীক্ষার পর আল্লাহর সাহায্য প্রত্যক্ষ করে, তখন তার অন্তরে জন্ম নেয় এমন ইয়াকিন, তাওয়াক্কুল, সবর ও আল্লাহর প্রতি মুহাব্বত, যা হয়তো স্বাচ্ছন্দ্যের জীবনে কখনো অর্জিত হতো না।
আল্লাহ বলেন:
“হতে পারে তোমরা কোনো বিষয় অপছন্দ কর অথচ তাতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে; আর হতে পারে তোমরা কোনো বিষয় পছন্দ কর অথচ তাতে তোমাদের জন্য অকল্যাণ রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।”
[আল কুরআন, আল-বাকারা, ২:২১৬
তাই আজ যে বিষয়টি আপনার কাছে কষ্টকর, হয়তো সেটিই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় ঈমানি সম্পদ হয়ে দাঁড়াবে।
শেষ পর্যন্ত মুমিনের বিশ্বাস একটাই:
“আমি জানি না আল্লাহ কীভাবে আমাকে উদ্ধার করবেন। কিন্তু আমি জানি, তিনি চাইলে এক মুহূর্তেই সবকিছু বদলে দিতে পারেন। তাই আমি পরিস্থিতির দিকে নয়, পরিস্থিতির মালিকের দিকে তাকাব।”
আর আল্লাহর প্রতিশ্রুতি:
“নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে।”[আল কুরআন, সূরা আশ-শারহ, ৯৪/৫–৬]
তাই দৃঢ় থাকুন। সবর করুন। দোয়া ছাড়বেন না। তাওয়াক্কুল হারাবেন না। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না।
কারণ আপনি যখন জানেন না সামনে কী আছে, তখনই তাওয়াক্কুলের প্রকৃত পরীক্ষা। আর আপনি যখন আল্লাহর ওপর ভরসা করে অটল থাকেন, তখন আপনার হৃদয়ের ইয়াকিনই হয়ে উঠতে পারে আপনার সবচেয়ে বড় অর্জন।