20/08/2026
হযরত মাওলানা প্রফেসর মোঃ জহুরুল ইসলাম আল কাদেরী (রহ.)
জন্ম: ১ অক্টোবর ১৯৪১, বুধবার
ইন্তিকাল: ৮ জানুয়ারি ২০০৪, বৃহস্পতিবার
বয়স: ৬৩ বছর
হযরত মাওলানা প্রফেসর মোঃ জহুরুল ইসলাম আল কাদেরী (রহ.) ছিলেন একই সঙ্গে একজন শিক্ষাবিদ, পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক, ইসলামী চিন্তাবিদ, দ্বীনি দাঈ এবং সুফি-সাধক।
তাঁর পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল দুনিয়াবি জ্ঞান ও দ্বীনি জ্ঞানের সমন্বয়। তিনি পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন অতিবাহিত করার পাশাপাশি কোরআন-হাদিসের আলোকে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক বিষয় বিশ্লেষণ ও ইসলামী চিন্তাধারা প্রচারে ভূমিকা রাখতেন।
শিক্ষাঙ্গনে তাঁর ভূমিকা
তিনি সরকারি জগন্নাথ কলেজে অধ্যাপনা করেন এবং পরবর্তীতে উপাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেন।
শিক্ষাঙ্গনে তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ছিল জুমার মসজিদ প্রতিষ্ঠা। উপাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রতিষ্ঠানে জুমার মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজে খতিবের দায়িত্বও পালন করেন।
অবসর গ্রহণের পর তাঁর স্কুলজীবনের শিক্ষক ড. মামুনুর রশিদ ও সাদেকুর রহমানের অনুরোধে তিনি কেরাণীগঞ্জের কলাতীয়া ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
দ্বীনি ও আধ্যাত্মিক জীবন
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁর দ্বীনি শিক্ষার হাতেখড়ি হয় তাঁর ওয়ালিদ আলহাজ্ব আইন উদ্দীন (রহ.)-এঁর নিকট।
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি দ্বীনি ইলম অর্জন এবং তা প্রচারে সক্রিয় ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ফুরফুরার পীর মুজাদ্দিদে জামান হযরত মাওলানা মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিকী আল-কুরাইশী ফুরফুরাবী (রহ.)-এঁর ছিলছিলায় বায়াত গ্রহণ করেন।
মাত্র ৩৭ বছর বয়সে তিনি হযরত মাওলানা ওয়াজিহুল্লা শাহ্ ছাহেব (রহ.) কর্তৃক তাঁর প্রথম ও প্রধান খলিফা নিযুক্ত হন।
পরবর্তীতে ফুরফুরার পীর হযরত মাওলানা আলহাজ্ব আবু নজম মোহাম্মদ নাজমুস সায়াদাত সিদ্দিকী আল-কুরাইশী ফুরফুরাবী (ন’হুজুর কিবলা) (রহ.) এবং তাঁর বড় ছাহেবজাদা হযরত মাওলানা আলহাজ্ব বাকীবিল্লাহ্ সিদ্দিকী আল-কুরাইশী ফুরফুরাবী (রহ.)-এর পক্ষ থেকেও তিনি পাঁচ তরিকায় খিলাফতের দায়িত্ব লাভ করেন।
ইবাদত ও আমল
তাঁর জীবনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে নিয়মিত ইবাদত-বন্দেগির কথা এসেছে।
তিনি—
* জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায়ে অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন;
* প্রত্যেক ওয়াক্ত নামাজের পর ওজিফা আদায় করতেন;
* সকাল-সন্ধ্যায় জিকির-আজকার করতেন;
* মুরাকাবা-মুশাহাদায় সময় কাটাতেন;
* দৈনিক কমপক্ষে ১০৫৫ বার দরূদ শরীফ পাঠ করতেন;
* বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার আসরের পূর্ব পর্যন্ত অতিরিক্ত দরূদ শরীফ পাঠ করতেন;
* তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করতেন;
* গভীর রাতে মুনাজাত ও আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকতেন।
* ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাততো দূরের কথা, এমনকি কোনো মুস্তাহাব আমলও তিনি ছেড়ে দিতেন না।
* একজন ইংরেজি শিক্ষিত মানুষ হওয়ার পরেও সিরাতে সুরাতে সুন্নাতে নববীর পূর্ণ নমুনা, নূরে মুজাসসাম তরিকায় চলা আল্লাহর একজন খাছ ওলী—ওলীয়ে মোকাম্মিল ছিলেন তিনি।
*তিনি পাস-আনফাস জিকির করতেন—শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে জিকিরকে যুক্ত রাখার একটি সাধনাপদ্ধতি হিসেবে এটি তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনের অংশ ছিল।
দ্বীনি প্রচার ও তা’লীম
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাহফিলে উপস্থিত হয়ে নসিহত করার পাশাপাশি তিনি নিজেও নিয়মিত হালকা ও তা’লীমি মাহফিল আয়োজন করতেন।
শেষ জীবনে নিজ কর্মস্থল কলাতিয়া ডিগ্রি কলেজে প্রতি সোমবার হালকায়ে জিকির ও তা’লীমি মাহফিল আয়োজন ও পরিচালনা করতেন।
এখানে তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল—শিক্ষাঙ্গনের মানুষদের মধ্যে দ্বীনি শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি ও জিকিরের পরিবেশ তৈরি করে তাছাউফের চর্চা করা।
ইন্তিকালের পূর্ববর্তী সময়
তাঁর শেষ জীবনের ঘটনাগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।
৭ জানুয়ারি তিনি ঢাকার ধানমন্ডিতে তাঁর পীর ন’হুজুর কিবলা (রহ.)-এঁর বার্ষিক ঈছালে ছাওয়াব মাহফিলে উপস্থিত হন। সেখানে ফুরফুরার দরবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য নসিহত করেন।
সেই রাতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ কিছু নসিহত করেন। বিশেষ করে মতের অমিল বা ক্ষতি হলেও ভাইয়ে ভাইয়ে মিলেমিশে থাকা এবং ছিলছিলার খিদমতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার কথা বলেন।
তিনি সে সময় গভীর শুকরিয়া প্রকাশ করে বলেন যে আল্লাহ্ পাক তাঁর জীবনের পূর্ণতা দান করেছেন এবং তাঁর জীবনে কোনো অপূর্ণতা নেই। তিনি কয়েকজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাঁদের ক্ষমা করে দেন।
ইন্তিকালের শেষ রাত
মাহফিলস্থলে তিনি এশার নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করেন।
শেষ রাতে ঘুম থেকে উঠে অজু করেন এবং শারীরিক কষ্ট থাকা সত্ত্বেও তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করেন। এরপর ফজরের নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করেন, কিছুক্ষণ মুরাকাবা করেন এবং মাসনুন দোয়া ও ওজিফা পাঠ করে ইশরাকের নামাজ আদায় করেন।
এরপর হালকা নাস্তা করে হাজারীবাগ থেকে তাঁর কর্মস্থল কেরাণীগঞ্জের কলাতীয়া কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
কলেজের মিটিং শেষে অন্য দিনের তুলনায় কিছুটা আগেই তিনি জোহরের নামাজের জন্য মসজিদে চলে যান। নামাজ আদায় করে কলেজে ফিরে দুপুরের খাবারের জন্য বসেন।
কিন্তু খাবার আর খাওয়া হয়নি। ওজুর অবস্থায়ই তাঁর ইন্তিকাল হয়।
তারিখ ছিল ৮ জানুয়ারি ২০০৪, বৃহস্পতিবার।
নামাজ ও রোজার ব্যাপারে যত্নবানঃ
তাঁ জীবনীতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে: “জীবনে এক ওয়াক্ত নামাজ বা একটা রোজাও কাজা হয়নি।” এটি তাঁর ইবাদত-নিষ্ঠার অনন্য নজির।
তাঁর চিন্তা ও আদর্শ
তাঁর জীবনদর্শনের কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারেঃ
১. ফরজের প্রতি অটল থাকা
ফরজ ইবাদতকে জীবনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।
২. সুন্নাতের অনুসরণ
সুন্নাতকে শুধু কথায় নয়, দৈনন্দিন জীবনাচরণের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা।
৩. জিকির ও মুরাকাবা
আত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য নিয়মিত জিকির, মুরাকাবা ও আত্মশুদ্ধির সাধনা।
৪. দ্বীনি ইলম ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়
পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হয়েও ইসলামী জ্ঞানচর্চা ও প্রচারের সঙ্গে যুক্ত থাকা তাঁর জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
৫. ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব
মতের অমিল হলেও পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট না করা এবং মিলেমিশে দ্বীনের খিদমত করার জন্য তিনি নসিহত করতেন।
৬. আত্মশুদ্ধি
নফসের পরিশুদ্ধি, তাকওয়া, জিকির ও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ককে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গ্রহণ করা।
তাঁর জীবন থেকে যে শিক্ষাগুলো নেওয়া যায়
বিভিন্ন তথ্যের আলোকে তাঁর জীবন থেকে বিশেষভাবে যে শিক্ষাগুলো সামনে আসে—
* ফরজ বিধিবিধান যথাযথভাবে পালন করা।
* সুন্নাতের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও পাবন্দ জীবনযাপন করা।
* তাকওয়া, জিকির ও মুরাকাবার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির চেষ্টা করা।
* দ্বীনি ইলম অর্জন করা এবং অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।
* নফসের পরিশুদ্ধির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া।
* দ্বীন ও মানবতার কল্যাণে ত্যাগ স্বীকার করা।
* মতের অমিল থাকলেও ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য বজায় রাখা।
* জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইবাদত, সঠিক আকিদা ও ঈমানের ওপর অবিচল থাকার চেষ্টা করা।
সংক্ষেপে
হযরত মাওলানা প্রফেসর মোঃ জহুরুল ইসলাম আল কাদেরী (রহ.)-এঁর জীবনকে সকল তথ্যের ভিত্তিতে তিনটি ধারার সমন্বিত জীবন হিসেবে দেখা যায়—শিক্ষা, দ্বীনি দাওয়াত, আত্মশুদ্ধি ও মানবতার কল্যাণ।
তিনি একদিকে ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও শিক্ষাঙ্গনের প্রশাসক; অন্যদিকে ছিলেন দ্বীনি জ্ঞানচর্চা, জিকির-মুরাকাবা ও আধ্যাত্মিক-সাধনার সঙ্গে যুক্ত একজন আলেম ও পীর-মুর্শিদের খলিফা। তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোর বর্ণনায় বিশেষভাবে ফুটে ওঠে নামাজ, তাহাজ্জুদ, জিকির, নসিহত, ক্ষমাশীলতা এবং আল্লাহর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতার বিষয়।
আল্লাহ্ তা’আলা হযরত মাওলানা প্রফেসর মোঃ জহুরুল ইসলাম আল কাদেরী (রহ.)-এঁর মাগফিরাত দান করুন, তাঁর মর্যাদা বুলন্দ করুন এবং জান্নাতুল ফেরদৌসের আলা স্থান দান করুন। আমীন। আমীন।।