25/06/2026
বিয়ের আগে থেকেই জব করি। বেবি হবার পর দুজন এসিস্ট্যান্ট ছিলো বাসায় বাচ্চার টেইক কেয়ারের জন্য। ঢাকায় তো তেমন কোন ডে কেয়ার ও ছিলো না তখন।
Pen-- Manira Sultana Papri
আমি বাসায় সি সি ক্যামেরা লাগিয়েছিলাম সব রুমে। আমার আর আমার হাজব্যান্ড এর কাছে ক্যামেরা একসেস ছিলো আমরা বাইরে থেকে ক্যামেরা অপারেট করতে পারতাম।
চাকরি আমার প্রয়োজন এবং পরিচয় দুটোই ছিলো। ঢাকা শহরে একটা মডারেট জীবন যাপন করতে হলে দুজনের চাকরি ছাড়া চলা টাফ।
এছাড়াও নিজের এত কষ্টে বানানো ক্যারিয়ার, আইডেন্টিটি সেটাও তো আমার অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ। অনেক পরিশ্রম নিজের অবস্থান বানিয়েছি৷ এক সাথে লড়ে গেছি।
তবু হার মানিনি, পরিস্থিতির কাছে।
মেয়েদের পথ চলা কোথাও সোজা না। না হোম মেকার হিসেবে,না চাকুরীজীবি হয়ে।
একটা মেয়েকে ঘরে- বাইরে কত কথা শুনতে হয় তার কাজে যাওয়া নিয়ে, কাজ করা নিয়ে। নিজের যোগ্যতায় চাকুরী পেলেও শুনতে হয়, চেহারার জন্য পেয়ে গেছে। প্রমোশন হলে শুনতে হয় বসের সুনজর আছে। অথচ একটা মেয়ে অফিসে যতক্ষণ থাকে সে চেষ্টা করে তার সবটুকু সময়,এটেনশন আর প্রোডাক্টিভিটির পুরোটা ঢেলে দিতে।
অফিসে একটা ছেলে কলিগরা আর সিগারেটের যে পরিমান ব্রেক নেয়, মেয়েরা তার দশ ভাগ ও নেয় না। এক টা ব্রেক যদি ১৫ মিনিটের ও হয় সারাদিনে একটা ছেলে যদি ৮ টা সিগারেট ও খায় এখানেই কিন্তু ২ ঘন্টা নাই।
অথচ কাজের জায়গায় মেয়েদের একটু ভুল হলেই বলা হয়, "মেয়ে মানুষ তো, মেক আপ করেই সময় পায় না।"
চাকুরীজীবি মায়ের জীবন তো আরো যা-তা। সকালবেলা সব গুছিয়ে দিয়ে বাসে ঝুলতে ঝুলতে নোংরা দৃষ্টি হজম করতে করতে পড়িমরি করে অফিস আসো, এর মধ্যে বাচ্চার খোঁজ নাও, ঠিক মতো খেলো কিনা, গোসল করলো কিনা, আবার একটু দেরী হয়ে গেলেই ঘরে কতো কথা শুনতে হয়।
কোন হাজব্যান্ড বলবে চাকরি ছাড়ো, আমি কি কম কামাই? হাজব্যান্ড সাপোর্টিভ হলে শ্বশুরবাড়ি থেকে বলবে সংসার ছাই হয়ে যাচ্ছে শুধু মেয়েটার চাকরির জন্য। আর যদি শ্বশুরবাড়ি সাপোর্ট দেয় তাহলে পাড়া প্রতিবেশী আর লতাপাতা আত্মীয়রা আছে না তাদের কান ভারী করার জন্য!
এমন ও শুনেছি, বাচ্চাদেরকেও ছাড়েনা। মায়া কান্না আর মায়ের চেয়ে মাসীর দরদ বেশি দেখিয়ে বলে, " আহারে বাচ্চাটার স্বাস্থ্যটা খারাপ,মা ঘরে থাকলে এমনটা হতো না।"
মায়ের এগেইন্সটে বাচ্চাদের মন বিষিয়ে তুলতেও তাদের দ্বিধা হয় না। অথচ, আমি দেখি যে মা ঘরে থাকেন, সারাদিন বাচ্চার পেছনে ছুটে ছুটেও বাচ্চাকে খাওয়াতে পারছেন না।
কারণ বাচ্চার এপেটাইট তো আর বাংলাদেশের সমাজ না, যে মা ঘরে থাকলে এপেটাইট বেড়ে যাবে আর কাজে থাকলে কমে যাবে।
বাচ্চা একটু দুষ্টুমি করলে, একটু অসুস্থ হলে সব দোষ মায়ের। মা চাকরী করে, তাই এমন হচ্ছে। অথচ গৃহিনী মায়ের ছেলেমেয়েরাও অসুস্থ হয় দুষ্টু হয়। মা তো মা-ই। সে ঘরে থাকুক বা বাইরে, মা কি তার সন্তানকে দুষ্টু বানায়?
বরং একজন কর্মজীবী মা হিসেবে আমার সন্তান এটা বুঝে গেছে, মা যতক্ষণ ঘরে থাকবে সেটা খুব ভ্যালুয়েবল, সেটা কোয়ালিটি টাইম।
আর মা বাসায় না থাকায় বেসিক নিজের কাজ গুলো নিজে করে নিতে শেখে, জানে মা ব্যস্ত, নিজেরটা নিজেকে পারতে হবে। বাচ্চারা আরো স্বনির্ভর হয়। মা ঘরে থাকলে,মায়ের উপর গা এলিয়ে দেয়া যায়। মায়েরা সন্তানকে একটু তো ছাড় দেন ই। মা তো।
অনেক নারী আছেন ঘরে থাকেন। হোম মেইকার। তাদের কাজ ও কম কিছু না। কর্মজীবী মা তো ছুটি পান। গৃহিণী মায়ের ছুটি কই? বেতন কই?
তার উপর প্রায়ই শুনতে হয়, সারাদিন তো ঘরে থাকো, বাচ্চার রেজাল্ট কেন খারাপ হলো? যেন সন্তানের দায় মায়ের শুধু একার। গৃহিণী মাকে টাকা চাইতে হয় স্বামীর কাছে, সন্তান দেখে তার মা আরেকজনের উপর নির্ভর করছে। কখনো চেয়ে পাচ্ছে, কখনো পাচ্ছেনা। এর প্রভাব ও তো তার উপর পড়ছে।
এক প্রতিবেশী মহিলাকে দেখতাম দুধ ওয়ালা, কাজের বুয়ার বেতন বেশি বলে হাজব্যান্ড এর কাছ থেকে টাকা নিতো। কিন্তু। কেন নিতো? কারন তাকে কোন হাত খরচ দেয়া হতোনা। একটা দোকানে সুন্দর ড্রেস বা একটা দরকারী কস্মেটিক্স কেনার ইচ্ছে হলেও কেনার সাধ্য নেই। কত হাত পাতা যায়? হোক না সে স্বামী!!
এই যে জায়গায় জায়গায় এভাবে নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে হয়, এর চেয়ে না হয় ঘরে একটা বা দুটা পদ কম রান্না হলো, নাহয় সংসারটা একটু কম গোছানো থাকলো, তবু তো নিজের একটা আলাদা পরিচয় থাকতো।
অথচ সংসার সামলানো এই নারী৷ সংসার নামক একটা কোম্পানিতে বিনা বেতনে,বিনা ছুটিতে,বিনা প্রমোশনে এবং সর্বোপরি বিনা স্বীকৃতিতে তার সারা বছর, সারা জীবন চাকরি করছেন।
এই শ্রমের মূল্য যদি বাজারে নির্ধারণ হয় তা কতো আসে জানেন? ২০১৯ এ একটা অনলাইন পোর্টালের তথ্যসূত্র অনুযায়ী এক বছরে একজন হোম মেকার মায়ের স্যালারি দাঁড়ায় $178,201 ডলার, বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমান দাঁড়ায় -- 15 482 099,32 টাকা।
জানি চোখ কপালে ওঠার মতো তথ্য। কেউ কেউ বলবেন নিজের সংসারের কাজের আবার মূল্য হয়? হয়।
আমাদের জীবন একটা সময়ের সমষ্টি।
Every minute counts.
এই সময় যদি পরিকল্পিত ভাবে ব্যয় হতো তাহলে সবার জীবন গুছিয়ে যেতো। একটা মেয়ে তার নিজের নিজস্ব স্বপ্নগুলো পারস্যু করতে পারতো।
তাকে শুনতে হতো না, সারাদিন ঘরে পড়ে পড়ে সে কি করে? কারোর কাছে নিজের স্যানিটারি ন্যাপকিন বা লঁজারি কেনার টাকার জন্য হাত পাততে হতোনা। হোক স্বামী, তবু তো আরেকটা মানুষ, তাই না?
আত্মসম্মানে লাগে তো! অপরদিকে যারা কর্মজীবী নারী, তারা অফিস, ঘর সব সামলাচ্ছে আর সারাক্ষণ খোঁটা শুনছে পদে পদে।
পরিবার, সমাজ যদি কো-অপারেটিভ হতো, এই মেয়েটাও হয়তো কোম্পানির একজন মোটামুটি লেভেলের এমপ্লয়ি না হয়ে সি ই ও হতো বা বেস্ট এম্পলয়ি এওয়ার্ড পেতো। শুধু একটু সাপোর্ট লাগে মেয়েদের। ওরা দুই কে চার বানিয়ে দেখাতে পারে, এক চুটকিতে।
অথচ দু হাতে বোঝা, দু পায়ে পাথর নিয়ে তাকে হাত-পা ঝাড়া পুরুষ কর্মীদের সাথে সমান ভাবে প্রতিযোগিতা করতে হয়। এখানে ইকুয়ালিটি না ইকুইটি দরকার ছিলো।
যে পথ দু পায়ে হাঁটতে একজন পুরুষের চার মিনিট লাগে, সে পথ, পাথর বাঁধা পায়ে একটা মেয়ের হাঁটতে ৮ মিনিট লাগে। রক্তাক্ত পায়ে। এই র ক্ত, এই পাথর খালি চোখে দেখা যায় না। সব র ক্তক্ষরণ কি আর চোখে দেখা যায়?