16/06/2026
আপনি কি জানেন, নারী দেবীদের পূজা করা প্যাগানদের ধর্মে কীভাবে একজন মেয়ে শিশুকে দেবতার সেবিকা সাজিয়ে আজীবন ধর্ষণ করা হয়?
মানব সভ্যতার ইতিহাস ঘাটলে নিষ্ঠুরতার অনেক বীভৎস এবং নারকীয় অধ্যায় চোখে পড়ে। এর আগে আমরা আলোচনা করেছিলাম কীভাবে সতীদাহ প্রথার নামে একজন জ্যান্ত এবং নিঃশ্বাস নেওয়া বিধবা নারীকে ঢাক-ঢোলের শব্দের আড়ালে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারা হতো।
তো সতীদাহ প্রথা ছিল চরম পৈশাচিক, কিন্তু সেখানে ওই নারীটির মৃত্যু অন্তত কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিশ্চিত হয়ে যেত। আগুনের লেলিহান শিখা তার শরীরের মাংসকে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়ে তাকে পৃথিবীর সমস্ত যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিত।
কিন্তু আজ আমরা ভারতবর্ষের ধর্মের মোড়কে লুকিয়ে থাকা এমন এক অন্ধকার, বিকৃত এবং রক্তসিক্ত ম্যাট্রিক্সের পাতা উল্টাব, যেখানে একজন নারীকে একবারে মেরে ফেলা হয় না। বরং ধর্মের নামে, দেবতার আশীর্বাদের নামে এবং পবিত্রতার এক মিথ্যা সাইকোলজিক্যাল ইলিউশন বা বিভ্রম তৈরি করে একজন নিরপরাধ নারীকে তিলে তিলে, প্রতিদিন, আজীবন জ্যান্ত ধর্ষণ করা হয়।
হিন্দু ধর্মের এই জঘন্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক যৌন দাসত্বের নাম হলো দেবদাসী প্রথা। সাধারণ মানুষ, এমনকি অনেক সুশীল সমাজও মনে করে, দেবদাসী মানে হয়তো মন্দিরের কোনো পবিত্র সেবিকা, যিনি দেবতার সামনে ধূপকাঠি জ্বালান, নাচ-গান করেন এবং আধ্যাত্মিক জীবনযাপন করেন। কিন্তু এই পবিত্র শব্দের আড়ালে যে বিশ্বের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে সুসংগঠিত এবং সবচেয়ে ডার্ক প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় পতিতাবৃত্তি বা ইন্সটিটিউশনালাইজড রিলিজিয়াস প্রস্টিটিউশন লুকিয়ে আছে, তা জানলে যেকোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের রক্ত হিম হয়ে যাবে।
কারণ এটি কেবল কোনো প্রাচীন প্রথা নয়, এটি হলো উচ্চবর্ণের পুরুষদের দ্বারা নিম্নবর্ণের অস্পৃশ্য নারীদের বৈধভাবে ধর্ষণ করার একটি ঐশ্বরিক লাইসেন্স।
এই নারকীয় ম্যাট্রিক্সের শুরুটা হয় এমন এক বয়সে, যখন একটি শিশুর পৃথিবীতে পাপ বা পুণ্য, ধর্ম বা যৌনতা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র কোনো ধারণাই থাকে না। দেবদাসী প্রথার সবচেয়ে ভয়ংকর এবং ট্রমাটাইজিং দিকটি হলো ভিকটিম বা শিকারের বয়স। এই প্রথায় মূলত পাঁচ থেকে নয় বছরের অবুঝ কন্যাশিশুদের টার্গেট করা হয়।
একটু কল্পনা করুন, পাঁচ বছরের একটি শিশু, যে হয়তো তখনো ঠিকমতো নিজের কাপড় পরতে শেখেনি, যে তখনো ধুলোবালিতে পুতুল নিয়ে খেলা করে, সেই শিশুটিকে কীভাবে একটি ভয়ংকর ফাঁদে ফেলা হয়?
মন্দিরের ধূর্ত পুরোহিতরা এবং সমাজের ক্ষমতাশালী মাতব্বররা অত্যন্ত সুকৌশলে গ্রামের চরম দরিদ্র, অশিক্ষিত এবং নিম্নবর্ণের (যেমন মাদিগা বা বাল্মীকি সম্প্রদায়) বাবা-মায়ের মস্তিষ্কে একটি ভয়ংকর আধ্যাত্মিক ভয় বা সাইকোলজিক্যাল ব্ল্যাকমেইল ঢুকিয়ে দেয়। তারা সেই গরিব বাবা-মাকে বোঝায় যে, তাদের পরিবারের ওপর দেবী ইয়েলোম্মা (Yellamma) বা অন্য কোনো দেবতার চরম অভিশাপ রয়েছে। এই অভিশাপ থেকে বাঁচতে হলে, অথবা পরিবারের মঙ্গল চাইলে, তাদের একটি কন্যাসন্তানকে দেবীর সেবার জন্য মন্দিরে উৎসর্গ করতে হবে।
ধর্মের ভয়, দেবতার অভিশাপের আতঙ্ক এবং চরম দারিদ্র্যের চাপে ওই অসহায় বাবা-মা তাদের নিজের নাড়িছেঁড়া ধন, ওই পাঁচ বা সাত বছরের অবুঝ শিশুটিকে তুলে দেয় মন্দিরের পুরোহিতদের হাতে।
এরপর শুরু হয় সেই শিশুটিকে একটি জ্যান্ত লাশে পরিণত করার প্রক্রিয়া। শিশুটিকে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে সাজানো হয়। তাকে বিয়ের কনের মতো শাড়ি পরানো হয়, গায়ে গহনা দেওয়া হয় এবং হাজার হাজার মানুষের সামনে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মন্দিরের গর্ভগৃহে। সেখানে পাথরের তৈরি সেই দেবীর মূর্তির সামনে ওই অবুঝ শিশুটির গলায় একটি বিশেষ মঙ্গলসূত্র বা পুঁতির মালা পরিয়ে দেওয়া হয়, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় মুত্তু (Muttu)।
এই একটি মাত্র মালা পরানোর মাধ্যমেই ওই শিশুটির জীবনের সমস্ত স্বাধীনতা, সমস্ত স্বপ্ন এবং স্বাভাবিক জীবনের অধিকার চিরতরে কেড়ে নেওয়া হয়। তাকে বোঝানো হয় যে, আজ থেকে সে আর সাধারণ কোনো মানুষ নয়, আজ থেকে সে স্বয়ং দেবতার স্ত্রী। দেবতার সাথে তার বিয়ে হয়ে গেছে। যেহেতু সে দেবতার স্ত্রী বা দেবদাসী, তাই সে জীবনে কখনো কোনো সাধারণ রক্তমাংসের পুরুষকে বিয়ে করতে পারবে না, সে কখনো নিজের সংসার পাততে পারবে না।
পাঁচ বছরের একটি শিশুর অবচেতন মনে অত্যন্ত সুকৌশলে এই সাইকোলজিক্যাল গ্রুমিং বা ব্রেনওয়াশ করা হয় যে, তার শরীর এখন দেবতার সম্পত্তি এবং সমাজের ক্ষমতাশালী পুরুষরা যখন তার শরীর ভোগ করবে, তখন মূলত দেবতার আশীর্বাদই তার ওপর বর্ষিত হবে।
একজন নিষ্পাপ শিশুকে দেবতার স্ত্রী সাজিয়ে, তাকে সমাজের পৈশাচিক পুরুষদের পাবলিক প্রপার্টি বা উন্মুক্ত সম্পত্তিতে পরিণত করার এই প্রক্রিয়াটি আক্ষরিক অর্থেই যেকোনো সুস্থ মানুষের গা শিউরে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
কিন্তু এই প্রথার সবচেয়ে লোমহর্ষক, পৈশাচিক এবং নির্মম অধ্যায়টি শুরু হয় তখন, যখন ওই শিশুটি ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। মেয়েটির বয়স যখন আট বা নয় বছর হয়, যখন সে প্রথমবারের মতো ঋতুমতী বা সাবালিকা (Puberty) হয়, তখন মন্দিরে কোনো শোক বা পবিত্রতার আবহাওয়া থাকে না, বরং সেখানে শুরু হয় এক নারকীয় উল্লাস।
মেয়েটি যখন প্রথমবারের মতো নারীত্বের শারীরিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, তখন তার প্রয়োজন পড়ে একজন মায়ের আদর, যত্ন এবং নিরাপত্তার। কিন্তু তার বদলে সমাজ এবং ধর্ম তাকে দাঁড় করিয়ে দেয় নিলামের মঞ্চে!
হ্যাঁ, এটি কোনো রূপকথা নয়, এটি একদম নিরেট এবং বীভৎস সত্য।
দেবীর নামে উৎসর্গকৃত সেই তথাকথিত পবিত্র মেয়েটির কুমারীত্ব বা ভার্জিনিটি আক্ষরিক অর্থেই নিলামে তোলা হয়। গ্রামের সবচেয়ে ক্ষমতাবান, সবচেয়ে ধনী উচ্চবর্ণের জমিদার, মহাজন, রাজনীতিক বা খোদ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত সেই নিলামের ডাক দেয়।
যে পুরুষ সবচেয়ে বেশি টাকা বা উপঢৌকন মন্দিরে দান করতে পারে, সে-ই সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে সেই নিলাম জেতে এবং সেই রাতের জন্য ওই সদ্য সাবালিকা মেয়েটিকে ভোগ করার, তার কুমারীত্ব হরণ করার পবিত্র অধিকার লাভ করে।
একটু চোখ বন্ধ করে ওই রাতটির কথা ভিজ্যুয়ালাইজ বা কল্পনা করার চেষ্টা করুন। আট বা নয় বছরের একটি আতঙ্কিত, ভীত এবং অসহায় কিশোরী, যাকে বলা হয়েছিল সে দেবতার স্ত্রী। তাকে একটি সুসজ্জিত অন্ধকার ঘরে আটকে রাখা হয়। আর তার সামনে দেবতার আশীর্বাদের দোহাই দিয়ে এসে দাঁড়ায় চল্লিশ বা পঞ্চাশ বছর বয়সী এক লালসাপূর্ণ, মদ্যপ এবং পৈশাচিক জমিদার বা পুরোহিত।
মেয়েটি বাঁচতে চায়, সে কাঁদতে থাকে, সে দেবতার মূর্তির দিকে তাকিয়ে হয়তো সাহায্য প্রার্থনা করে। কিন্তু কেউ তাকে বাঁচাতে আসে না। মন্দিরের চারপাশের উৎসব, উল্লাস এবং ঘণ্টার শব্দের আড়ালে ওই শিশুটির আর্তনাদ এবং কান্না চিরতরে চাপা পড়ে যায়।
ধর্মের নামে, পবিত্রতার নামে, পূজার নামে একজন অবুঝ শিশুকে আইনগত এবং সামাজিকভাবে ধর্ষণ করার এমন প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা পৃথিবীর আর কোনো সভ্যতায়, আর কোনো ইতিহাসে আপনি খুঁজে পাবেন না।
এই একটি রাতের পরেই ওই মেয়েটির জীবন একটি খোলা ডাস্টবিনে পরিণত হয়। নিলাম জেতা ওই জমিদার হয়তো কয়েকদিন পর তাকে ছেড়ে দেয়, এরপর তাকে ভোগ করে মন্দিরের অন্যান্য পুরোহিতরা, গ্রামের অন্যান্য ক্ষমতাশালী মাতব্বররা।
সে সমাজের চোখে পবিত্র যোগিনী বা দেবদাসী, কিন্তু বাস্তবে সে হলো ওই উচ্চবর্ণের পুরুষদের লালসা মেটানোর একটি জীবন্ত, নিঃশ্বাস নেওয়া মাংসপিণ্ড।
এই পুরো ম্যাট্রিক্সের সবচেয়ে জঘন্য এবং ডাবল স্ট্যান্ডার্ড বা ভণ্ডামির জায়গাটি হলো এদের জাতপাতের হিসাব।
একটু গভীরভাবে খেয়াল করলেই এই হিন্দু ধর্মের বর্ণপ্রথা বা জাতপাতের সবচেয়ে কদর্য রূপটি এখানে একদম নগ্ন হয়ে ধরা পড়ে। ডেটা এবং পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, এই দেবদাসীদের পঁচানব্বই শতাংশেরও বেশি আসে সমাজের সবচেয়ে নিচু স্তর থেকে, দলিত, অস্পৃশ্য এবং চরম অবহেলিত সম্প্রদায় থেকে। অন্যদিকে, এদের যারা নিলামে কেনে, এদের শরীর যারা বছরের পর বছর ধরে ভোগ করে, তাদের প্রায় সবাই হলো উচ্চবর্ণের হিন্দু, যেমন ব্রাহ্মণ বা ক্ষমতাশালী জমিদার শ্রেণি।
দিনের বেলায় এই উচ্চবর্ণের পুরুষরা রাস্তায় চললে যদি কোনো দলিতের ছায়াও তাদের গায়ে লাগে, তবে তারা নিজেদের অপবিত্র মনে করে। তারা ওই দলিতদের ছোঁয়া পানি পান করে না, তাদের সাথে বসে খাবার খায় না, তাদের মন্দিরে ঢুকতে দেয় না এবং তাদের অস্পৃশ্য বা অচ্ছুত বলে গালি দেয়। কিন্তু রাতের বেলায়, অন্ধকার ঘরে, যখন লালসা মেটানোর প্রয়োজন হয়, তখন ওই অস্পৃশ্য দলিত মেয়েটির শরীর ভোগ করতে তাদের জাত যায় না! দিনের বেলায় যে মেয়েটি অচ্ছুত, রাতের বেলায় দেবতার সেবিকার মোড়কে সেই মেয়েটিকে ধর্ষণ করাটা তাদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র একটি ধর্মীয় অধিকার হয়ে দাঁড়ায়।
জাতপাত এবং ধর্মের এমন ভয়ংকর, নির্লজ্জ এবং চরম ভণ্ডামিপূর্ণ ব্যবহার পৃথিবীর ইতিহাসে সত্যিই বিরল।
কিন্তু একজন দেবদাসীর জীবনের ট্র্যাজেডি শুধু যৌবনেই শেষ হয় না, বরং বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার জীবন এমন এক নরকে পরিণত হয়, যা মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর।
একজন দেবদাসীর কদর ঠিক তত দিনই থাকে, যত দিন তার শরীরে যৌবনের জৌলুস থাকে, যত দিন তার অঙ্গ টানটান থাকে এবং পুরুষদের আকর্ষণ করার ক্ষমতা থাকে। বয়স যখন পঁচিশ বা ত্রিশের কোঠায় পৌঁছায়, যখন একাধিক পুরুষের পাশবিক অত্যাচারে এবং পুষ্টিহীনতায় তার শরীর ভেঙে পড়ে, তখন ওই ধর্ম, ওই মন্দির এবং ওই সমাজ তাকে আক্ষরিক অর্থেই একটি ব্যবহৃত এবং দুর্গন্ধযুক্ত টিস্যু পেপারের মতো ছুড়ে ফেলে দেয়।
যে সমাজ তাকে পাঁচ বছর বয়সে দেবতার স্ত্রী বলে মাথায় তুলেছিল, সেই সমাজই তার যৌবন ফুরিয়ে যাওয়ার পর তাকে মন্দির থেকে বের করে দেয়। তার কোনো স্বামী নেই, তার কোনো সংসার নেই, তার কোনো নির্দিষ্ট রোজগার বা বেঁচে থাকার কোনো সম্মানজনক উপায় নেই। বেঁচে থাকার তাগিদে, পেটের ক্ষুধার জ্বালায় এই বাতিল হয়ে যাওয়া দেবদাসীদের একটি বিশাল অংশ তখন বাধ্য হয়ে পাড়ি জমায় মুম্বাই বা পুনের মতো বড় শহরের রেড লাইট এরিয়া বা নিষিদ্ধ পল্লিগুলোতে। কামাথিপুরার মতো অন্ধকার পতিতালয়গুলোতে তাদের স্থান হয়।
যারা শহরে যেতে পারে না, তারা গ্রামের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ভিক্ষা করে, মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পাতে। বছরের পর বছর ধরে অগণিত এবং অরক্ষিত পুরুষের সাথে শারীরিক সম্পর্কের কারণে এদের একটি বিশাল অংশ এইচআইভি (HIV/AIDS), সিফিলিস এবং গনোরিয়ার মতো ভয়ংকর এবং প্রাণঘাতী যৌনরোগে আক্রান্ত হয়। তাদের শরীরে পচন ধরে, মাংসে ঘা হয়ে যায়। কোনো চিকিৎসা জোটে না, কোনো ওষুধ জোটে না।
রাস্তার পাশে, কোনো অন্ধকার গলিতে বা পতিতালয়ের দুর্গন্ধযুক্ত ঘরে এই তথাকথিত পবিত্র দেবদাসীরা ধুঁকে ধুঁকে, পচে গলে এক চরম যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তাদের মৃত্যুর পর তাদের লাশটি দাহ করার মতোও আপন বলতে কেউ থাকে না।
এই অভিশাপ এখানেই শেষ হয় না, এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ট্রান্সফার বা স্থানান্তরিত হয়। একজন দেবদাসীর জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো তার গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তানরা।
যেহেতু একজন দেবদাসীর নির্দিষ্ট কোনো স্বামী থাকে না এবং তাকে সমাজের অসংখ্য পুরুষ ভোগ করে, তাই তার গর্ভে জন্ম নেওয়া শিশুটির কোনো পিতৃপরিচয় থাকে না। ওই সমাজের ক্ষমতাশালী পুরুষরা রাতের বেলা নারীর গর্ভে সন্তান জন্ম দেয় ঠিকই, কিন্তু দিনের আলোতে তারা ওই সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করে। সমাজ অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে ওই নিরপরাধ শিশুগুলোকে জারজ বলে গালি দেয়।
পিতৃপরিচয় না থাকার কারণে এই শিশুরা স্কুলে ভর্তি হতে পারে না, তারা সমাজের মূলধারায় মিশতে পারে না। সমাজ তাদের একঘরে করে রাখে।
ফলস্বরূপ কী হয়? একজন দেবদাসীর গর্ভে জন্ম নেওয়া ছেলে শিশুটি বড় হয়ে হয় কোনো সন্ত্রাসী বা ভিক্ষুক, আর তার গর্ভে জন্ম নেওয়া ফুটফুটে মেয়ে শিশুটি পেটের দায়ে এবং সমাজের চাপে বাধ্য হয়ে তার মায়ের পথেই পা বাড়ায়। সেও পরিণত হয় আরেকজন দেবদাসী বা পতিতাতে।
ধর্মের নামে তৈরি করা এই ম্যাট্রিক্স প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটি নিরপরাধ গোষ্ঠীকে যৌন দাসত্বের এক অন্তহীন চক্রে আটকে রাখে।
আপনি হয়তো ভাবতে পারেন যে, এই ভয়াবহ এবং পৈশাচিক প্রথাটি হয়তো আজ থেকে হাজার বছর আগের কোনো অন্ধকার যুগের কাহিনী। কিন্তু চরম সত্য এবং সবচেয়ে বড় ট্রমাটাইজিং ফ্যাক্টটি হলো, এই প্রথা আজও চলছে!
আমরা আজ ২০২৬ সালের আধুনিক পৃথিবীতে বসে আছি, যেখানে মানুষ মঙ্গলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে দুনিয়া জয় করছে, সেই একই সময়ে ভারতের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে আজও ছোট ছোট মেয়েদের দেবতার নামে উৎসর্গ করা হচ্ছে। ভারত সরকার ১৯৮২ সালে কর্ণাটক দেবদাসী প্রথা বিলোপ আইন এবং পরবর্তীতে আরও অনেক আইনের মাধ্যমে কাগজে-কলমে এই প্রথাকে সম্পূর্ণ অবৈধ এবং নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
কিন্তু আইন দিয়ে কি আর হাজার বছরের শেকড় গেড়ে বসা অন্ধকার এবং সাইকোলজিক্যাল ব্রেনওয়াশ দূর করা যায়?
কর্ণাটকের সাউদাত্তি (Saundatti) এলাকার ইয়েলোম্মা মন্দির, মহারাষ্ট্রের কিছু অংশ, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তেলেঙ্গানার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে আজও প্রতি বছর পূর্ণিমার রাতে গোপনে হাজার হাজার ছোট মেয়েকে দেবতার নামে উৎসর্গ করে এই ডার্ক সেক্সুয়াল ম্যাট্রিক্সের বলি বানানো হচ্ছে।
প্রশাসন জানে, পুলিশ জানে, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা সব জানে, কিন্তু ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার ভয়ে, অথবা নিজেদের লালসা চরিতার্থ করার স্বার্থে কেউ টুঁ শব্দটিও করে না। আন্ডারগ্রাউন্ডে বা সমাজের চোখের আড়ালে এই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ষণ আজও অত্যন্ত রমরমাভাবে চলছে।
যখন আমরা এই পুরো চিত্রটিকে ইমোশন এবং অন্ধবিশ্বাসের ফিল্টার সরিয়ে একদম নগ্ন চোখে দেখি, তখন আধুনিক বিশ্বের এই তথাকথিত নারী-বান্ধব বা অহিংস ধর্মের আসল রূপটি আমাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে যায়। যারা নারী অধিকার নিয়ে বড় বড় লেকচার দেয়, যারা নিজেদের কিতাবের রূপকথার দেবীদের পূজা করার অহংকার করে, তাদের সমাজেই আজ হাজার হাজার অবুঝ মেয়েকে ধর্মের নামে জ্যান্ত ছিঁড়ে খাওয়া হচ্ছে।
সতীদাহ প্রথায় একটি মেয়ে একবারের জন্য পুড়ে অঙ্গার হতো, কিন্তু দেবদাসী প্রথায় একটি মেয়েকে প্রতিদিন, প্রতি রাতে, তার আত্মার প্রতিটি কোষে কোষে পুড়িয়ে মারা হয়।
একটি পাথরের মূর্তিকে তারা সাজিয়ে গুছিয়ে দুধ দিয়ে স্নান করায়, আর সেই মূর্তির সামনেই তারা একজন রক্তমাংসের, নিঃশ্বাস নেওয়া জ্যান্ত মানুষের জীবনকে নরকে পরিণত করে।
ইতিহাস এবং ধর্মতত্ত্বের এর চেয়ে বড় ভণ্ডামি, এর চেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিক দেউলিয়াত্ব আর দ্বিতীয়টি হতে পারে না। এই দেবদাসীদের নীরব কান্না এবং তাদের অভিশপ্ত জীবন আজও আমাদের সভ্যতার দিকে আঙুল তুলে হাসছে এবং প্রশ্ন করছে, যে দেবীকে তোমরা মন্দিরে পূজা করো, সেই দেবী কি কখনো দেখতে পায় না যে তারই সেবিকার নামে কীভাবে একটি জ্যান্ত শিশুকে প্রতিদিন ছিঁড়ে খাওয়া হচ্ছে?
সত্য সব সময়ই ভয়ংকর এবং অস্বস্তিকর। কিন্তু এই সত্যগুলোকে সামনে না আনলে আমরা কখনোই বুঝতে পারব না যে, ধর্মের নামে তৈরি করা মানুষের এই পৈশাচিক ম্যাট্রিক্স কতগুলো নিরীহ জীবনকে অনন্তকালের জন্য অন্ধকারে নিক্ষেপ করেছে।
©তাওহীদুল ইসলাম