30/08/2025
ভূঁই আমলা
আমাদের আশপাশে রাস্তার ধারে,পতিত জমিতে এক দেড় ফুট লম্বা ছোট্ট গুল্ম জাতীয় এই গাছটি প্রায়ই চোখে পড়ে। আমলকির মত ঝিরি ঝিরি পাতা, পাতার নিচে কক্ষ বরাবর সার দিয়ে সরষে দানার মত ফুল ও ফল, ঠিক যেন আমলকির ক্ষুদ্র সংস্করণ। হ্যাঁ বর্ষজীবি এই মহামূল্যবান, অসাধারন ঔষধী গুণসম্পন্ন গাছটি প্রজাতিগতভবে আমলকিরই মাসতুতো বোন। দুই বাংলা সমেত ভারতের সমস্ত নাতিশীতোষ্ণ অঞলেই ভূঁইআমলা পাওয়া যায়।
গ্ৰীষ্মের শেষে গাছ বের হয়, বর্ষাশেষে ফুল ফল ধরে,শীতের শুরুতে ফল পাকতে থাকে। সমগ্ৰ গাছই ঔধধ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। গাছ সংগ্ৰহের সময় শীতকাল এবং এটি ছায়ায় রেখে শুকনো করা উচিত। মনে রাখবেন, ভিজে স্যাঁতসেতে জমিতে জন্মানো গাছের তুলনায় বালি কাঁকুরে জমির গাছের ভেষজ গুণ অনেক বেশি হয়।
নাম পর্যায়ঃ সংস্কৃতে ভূঁই আমলার বহু নাম, তামলকী, উচ্চটা,বহুবীর্য, ভূম্যালকী, বীরা তার মধ্যে অন্যতম। হিন্দীতে - ভূঁই তামল, ভদ্র আম্বড়া, পাতাল আম্বড়া। বৈজ্ঞানীক নাম Phyllanthus fraternus, Syn. name Phyllanthus niruri
গুণাবলী ও ব্যবহার বিধিঃ ভূঁই আমলার ভেষজ গুণের সীমা পরিসীমা নেই। অসংখ্য এর লৌকিক ব্যবহার। প্রধান কার্যকারিতা গুলো উল্লেখ করছি।
যকৃত বা লিভারের রোগে (অবস্ট্রাকটিভ জন্ডিস ব্যতীত) ভূই আমলার থেকেও বেশি কার্যকর কোন ঔষধ এতদঞলে নেই। কাঁচা শিকড় ৩ - ৪ গ্ৰাম অথবা শুকনো শিকড় ২ গ্ৰাম ৩-৪টি গোলমরিচ সহ ভাতের আমানী ( পান্তা ভাতের জল ) দিয়ে বেটে সকালে– বিকালে খালিপেটে খেলে ৭ থেকে ১০ দিনে জন্ডিস উপশম হবেই। সঙ্গে সুপথ্য ও বিশ্রাম অবশ্যই প্রয়োজন। যকৃতের সঙ্গে প্লীহা (স্প্লীন) ও পাকস্থলী (স্টম্যাক) এরও গন্ডগোল থাকলে ভূঁই আমলার শিকড় ও গোলমরিচের সঙ্গে ৭-৮টি কালমেঘ পাতা আমানী দিয়ে বেটে একই নিয়মে খেলে ও দুটির উপসর্গও সেরে যাবে।
সমগ্ৰ গাছ মূত্রকৃচ্ছতায় খুবই উপকারী। কাঁচা গাছ ১০ - ১২ গ্ৰাম অথবা শুকনো গাছ ৫ - ৬ গ্ৰাম, ২০০- ২৫০ গ্ৰাম জলে ফুটিয়ে ঠান্ডা করে দিনে দু বার, নিয়মিত ৮ - ১০ দিন খেলে ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (U T I), প্রষ্টেটাইটিস অথবা গণোরিয়া জাতীয় যৌন রোগের কারনে পেচ্ছাপ আটকে যাওয়া নিরাময় হবেই ।
কাঁচা পাতার রস এক চামচ( ৫ মি লি ) সকাল বিকাল খালিপেটে নিয়মিতভবে ৫ - ৬ দিন খেলে পেটখারাপ ও সাদা আমাশা সেরে যাবে। দীর্ঘ রোগভোগের পর এই রস একই নিয়মে ৩ - ৪ টি গোলমরিচের গুঁড়ো সমেত সকাল - বিকাল বেশ কিছু দিন খেলে বলদায়ক টনিকের মত কাজ করে।
পাতা ও কান্ড ছিঁড়লে যে রসটা বেরোয় ওটি দূষিত ও পুরানো ঘায়ে এবং নখ কুনিতে দিনে দু বার করে লাগালে ভাল হয়ে যাবে।
উপজাতি চিকিৎসকরা আমানী, গোলমরিচ, হলুদ ও পিপুল অনুপান সহযোগে বহুরোগে জর আমলা/ বদর / মারাঙ্গ বা ভূঁই আমলাকে ঔষধরূপে সফলভবে ব্যবহার করেন বা বলা ভাল, করতেন। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত আজ হারিয়ে যেতে বসেছে সব লোকায়ত চিকিৎসা পদ্ধতি। এখনি এগুলির যথাযথ খোঁজসন্ধান করে লিপিবদ্ধ করা প্রয়োজন। নাহলে বহুদিন ধরে চলে আসা এই অসাধারন ফলিত জ্ঞান সম্পূর্ণ অবলুপ্ত হয়ে যাবে। অব্যবহারের জন্য একদিন হারিয়ে যাবে হাতের কাছের অমূল্য এই গাছ, ভূঁই আমলাও ।
নতুন তথ্য সংযোজন আশা করছি আপনাদের কাছ থেকেও। আপনাদের মূল্যবান মতামতও প্রণিধেয়।