09/08/2026
সিহরুল আরহাম-জরায়ুর জাদু: সংজ্ঞা, ধরন, লক্ষণ ও চিকিৎসা
সিহরুল আরহাম (سحر الأرحام) কী?
সিহরুল আরহাম হল এক ধরনের জাদু যা নারীদের জরায়ু এবং প্রজনন ব্যবস্থার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। এ জাদু বিবাহিত নারী কিংবা অবিবাহিত নারী উভয়ের উপরই কাজ করতে পারে।
বিবাহিত নারীর ক্ষেত্রে কথিতভাবে এমন জাদুর উদ্দেশ্য থাকে সন্তান ধারণে বাধা সৃষ্টি করা। আর কোনোভাবে গর্ভধারণ হয়ে গেলেও গর্ভ যেন পূর্ণতা না পায়, এমনকি গর্ভপাত হয়ে যায়-এমন উদ্দেশ্যেও এটি করা হতে পারে। সংক্ষেপে বলা যায়, এই ধরনের জাদুর মাধ্যমে কোনো নারীকে সম্পূর্ণভাবে গর্ভধারণ থেকে বাধাগ্রস্ত করা অথবা গর্ভধারণের পর তা পূর্ণ হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হয়।
রুকইয়াহর বর্ণনা অনুযায়ী, এই ধরনের জাদুর খাদেম জিন নারীর জরায়ুকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করার চেষ্টা করতে পারে। এর ফলে স্বামীর প্রতি অনীহা, দাম্পত্য সম্পর্কে অস্বস্তি, গর্ভধারণে বাধা কিংবা গর্ভপাতের মতো বিষয় দেখা দিতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে অনেক নারী চিকিৎসকের কাছে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ গ্রহণ করতে থাকেন। কিন্তু কখনো কখনো দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেওয়ার পরও স্পষ্ট কোনো চিকিৎসাগত কারণ পাওয়া যায় না, অথচ বন্ধ্যাত্ব বা গর্ভধারণের সমস্যাটি থেকেই যায়। রুকইয়াহর দৃষ্টিকোণ থেকে এমন অবস্থাকে কেউ কেউ সিহরুত তাতীলিল-ইনজাব (সন্তান ধারণে বাধা সৃষ্টিকারী জাদু)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে মনে করেন।
তবে একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে-আল্লাহর অনুমতি ও ইচ্ছা ছাড়া কোনো জাদুই কারও ক্ষতি করতে পারে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:
وَمَا هُم بِضَارِّينَ بِهِ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ
অর্থ: “তারা আল্লাহর অনুমতি ছাড়া এর মাধ্যমে কারও কোনো ক্ষতি করতে পারে না।”
-সূরা আল-বাকারা: ১০২
স্বপ্নে সিহরুল আরহামের কিছু লক্ষণ
রুকইয়াহর অভিজ্ঞতায় কিছু রোগী স্বপ্নের মধ্যে অস্বাভাবিক ও ভয়ংকর কিছু দৃশ্য দেখার কথা বলে থাকেন। যেমন-
° অদ্ভুত ও ভয়ংকর আকৃতির কোনো নারীকে দেখা, যে পেশেন্টের জরায়ুর দিকে হাত প্রবেশ করাচ্ছে এবং এর পর পেশেন্ট স্বপ্নের মধ্যেই ব্যথা অনুভব করছে।
° পেটের ভেতরে কোনো গোলাকার বস্তুর মতো কিছু নড়াচড়া করছে এবং সেটি জরায়ুর দিকে অবস্থান করছে-এমন স্বপ্ন দেখা।
° স্বপ্নে বারবার অনেক শিশু দেখা।
° জরায়ু থেকে সাপ বের হতে দেখা অথবা সাপকে জরায়ুর ভেতরে প্রবেশ করতে দেখা।
জাগ্রত অবস্থায় যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে
সিহরুল আরহামের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে বর্ণিত লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে-
নারীর বুক ধড়ফড় বা চাপ অনুভূত হওয়া, তীব্র মাথাব্যথা-যা অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীর সাক্ষাতের সময় বা দাম্পত্য সম্পর্কের সময় বেড়ে যেতে পারে। এর পাশাপাশি অস্থিরতা, মাসিকের সময় অস্বাভাবিক ব্যথা এবং কোমরের দুই পাশ বা পার্শ্বদেশে ব্যথাও অনুভূত হতে পারে।
এছাড়াও পেটে ব্যথা, পাকস্থলীতে ব্যথা এবং কখনো কখনো হালকা কিংবা অতিরিক্ত রক্তপাতের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
কোমরের নিচের অংশে এবং তার বিপরীত দিকে জরায়ু অঞ্চলে ব্যথা, মাসিকের অনিয়ম, মাসিক আটকে থাকা, আবার কখনো অল্প অল্প করে বা বিরতিতে রক্তপাত হওয়া-এসব সমস্যাও উল্লেখ করা হয়।
এর পাশাপাশি গর্ভপাত, সন্তান ধারণে দীর্ঘদিন ব্যর্থতা কিংবা গর্ভের শিশুর অস্বাভাবিকতার মতো সমস্যার কথাও বলা হয়।
কখনো কখনো অস্বাভাবিক তরল ও দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব বের হতে পারে।
পেশেন্টের মধ্যে নিকটাত্মীয়দের প্রতি, বিশেষ করে স্বামীর প্রতি অস্বাভাবিক ও তীব্র বিরক্তি বা ঘৃণার অনুভূতি তৈরি হতে পারে।
আবার কারও কারও জরায়ুমুখ বা যোনিপথের প্রদাহের মতো জ্বালাপোড়া, অতিরিক্ত গরম অনুভূতি ও ব্যথা হতে পারে। ফলে ধীরে ধীরে স্বামীর প্রতি অনীহা ও দাম্পত্য সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
রুকইয়াহ সংশ্লিষ্ট কিছু বর্ণনায় আরও বলা হয়, এ ধরনের জাদুর প্রভাবে নারীর ডিম্বস্ফোটন বা ovulation-এর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে কিংবা পুরুষের শুক্রাণুর কার্যকারিতার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
কখনো ডিম্বাণুর স্বাভাবিক হরমোনাল কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করা অথবা ডিম্বাণু চলাচলের পথ-জরায়ুর নালি বা ফ্যালোপিয়ান টিউব-বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যার কথাও উল্লেখ করা হয়।
এমনকি ডিম্বস্ফোটনের সময় স্ত্রী স্বামীর প্রতি অস্বাভাবিক অনীহা অনুভব করতে পারেন এবং যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যেতে পারে, যার ফলে স্বাভাবিকভাবে নিষেকের প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
সিহরুল আরহামের চিকিৎসা কী?
এ ধরনের সমস্যার ক্ষেত্রে শরিয়াহসম্মত রুকইয়াহ, কুরআনের আয়াত, নবী ﷺ থেকে প্রমাণিত দোয়া এবং আল্লাহর কাছে একনিষ্ঠভাবে সাহায্য চাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
প্রয়োজনে অভিজ্ঞ রাক্বির সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। রুকইয়াহর সময় জিনের ওপর শরিয়াহসম্মতভাবে দোয়া করা, জাদু বাতিলের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা এবং কুরআনের আয়াত পাঠ করা হয়।
রুকইয়াহর সময় কোনো কোনো রোগী পেটের ভেতরে গোলাকার কিছু নড়াচড়া করার অনুভূতি কিংবা স্পন্দনের সঙ্গে সামান্য ব্যথা অনুভব করতে পারেন। রুকইয়াহর ব্যাখ্যায় এটিকে কখনো জিনের অবস্থান, কখনো জাদু ও গিঁটের প্রভাব, আবার কখনো উভয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে মনে করা হয়।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে রাখা জরুরী -জরায়ু, গর্ভধারণ, মাসিকের অনিয়ম, রক্তপাত, স্রাব, গর্ভপাত বা বন্ধ্যাত্বের মতো সমস্যার ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞানকে বাদ দেওয়া যাবে না। এসব সমস্যার অনেকগুলোরই সুস্পষ্ট শারীরিক ও হরমোনজনিত কারণ থাকতে পারে। তাই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি রুকইয়াহ করা যেতে পারে।
কারণ চিকিৎসা গ্রহণ করা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়; বরং রাসূলুল্লাহ ﷺ চিকিৎসা গ্রহণের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। আর শিফা দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা।
আমরা চিকিৎসা করব, রুকইয়াহ করব, দোয়া করব -কিন্তু অন্তরকে আল্লাহর ওপরই নির্ভরশীল রাখব।
আল্লাহ তাআলা সকল অসুস্থ নারী-পুরুষকে পূর্ণাঙ্গ শিফা দান করুন, সন্তান লাভের আকাঙ্ক্ষায় যারা কষ্টে আছেন তাদের নেক ও সুস্থ সন্তান দান করুন এবং সব ধরনের অকল্যাণ থেকে আমাদের হেফাজত করুন।
اللَّهُمَّ اشْفِ كُلَّ مَرِيضٍ شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا
হে আল্লাহ! প্রত্যেক অসুস্থ ব্যক্তিকে এমন পূর্ণাঙ্গ সুস্থতা দান করুন, যার পরে কোনো অসুস্থতা অবশিষ্ট না থাকে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সব ধরনের অনিষ্ট ও বিপদ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
__✍️Raqi Sultan Mahmud
Senior Raqi & Consultant - Nabawi Life
সুস্থতার পথে অন্যকে সহায়তা করতে সদাকায়ে জারিয়ার নিয়তে পোস্টটি শেয়ার করুন।
☎️01706685576
☎️01618901150
Raqi Sultan Mahmud
Md. Sultan Mahmud Ashraf