20/04/2026
নবজাতক শিশু কি পর্যাপ্ত দুধ পাচ্ছে? কীভাবে বুঝবেন?
একজন নতুন মা তো বটেই, পুরো পরিবারেরই সবচেয়ে বড়ো দুশ্চিন্তার জায়গা হলো, "বাচ্চা কি পর্যাপ্ত দুধ পাচ্ছে?" ক্ষণে ক্ষণে মনে হয়, বাচ্চা খাচ্ছে না কিছুই।
তবে বাস্তবতা হলো, পর্যাপ্ত দুধ না পাওয়ার ভয় যতোটা, বাস্তবে সেই সমস্যা ততোটা প্রকট না। কয়েকটি বিষয় অবজার্ভ করে নিজে নিজেই বোঝা যাবে আসলেই পর্যাপ্ত দুধ পাচ্ছে কি-না।
#প্রস্রাবের হিসেবই গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড
শিশুর শরীরে পানিশূন্যতা আছে কিনা তা বোঝার সবচেয়ে নির্ভুল উপায় প্রস্রাবের দিকে খেয়াল করা। UNICEF-এর গাইডলাইন অনুযায়ী, প্রস্রাবের সংখ্যা দিয়েই বোঝা যাবে পর্যাপ্ত দুধ পাচ্ছে কি-না।
১ম দিন ১ বার
২য় দিন ২ বার
৩য় দিন ৩ বার
৪র্থ দিন ৪-৬ বার
৫ম দিন ও তার পরবর্তী দিনগুলোতে ৬-৮ বার
যদি এই অনুযায়ী শিশুর প্রস্রাব হয়, তাহলে বুঝে নেয়া যায় শিশু পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে।
জন্মের ৩য় থেকে ৪র্থ দিনের মধ্যে মায়ের দুধের সরবরাহ প্রায় ৫০০-৭০০ মিলিপর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, যা একজন সুস্থ নবজাতকের চাহিদার জন্য যথেষ্ট।
#দ্বিতীয় বিষয়টি আসবে মলের রং ও ফ্রিকোয়েন্সি
WHO-এর মতে, মলের রং এবং টেক্সচার দেখে বাচ্চার পুষ্টি গ্রহণের হার বোঝা যায়। ৪র্থ দিনের পর থেকে মল যদি কালচে (Meconium) থেকে বদলে সরিষার মতো উজ্জ্বল হলুদ (Mustard Yellow) হয় এবং নরম বা দানাদার থাকে, তবে ধরে নিতে হবে বাচ্চা পর্যাপ্ত ক্যালোরি পাচ্ছে।
দৈনিক ৩-৪ বার পায়খানা করা একটি সুস্থ বাচ্চার স্বাভাবিক লক্ষণ।
#তৃতীয় বিষয়টি আসবে ওজন পরিবর্তনে সংক্রান্ত
জন্মের প্রথম ৩-৫ দিনে প্রতিটি শিশুর ওজন স্বাভাবিকভাবেই ৫% থেকে ১০% পর্যন্ত কমতে পারে। এটি কোনোভাবেই 'দুধ কম পাবার' লক্ষণ নয়, বরং শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি বেরিয়ে যাওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
১০ থেকে ১৪ দিনের মাথায় শিশু সাধারণত তার জন্মের ওজনে ফিরে আসবে।
জন্মের পর থেকে ২য় মাস পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে গড়ে ১৫০-২০০ গ্রাম ওজন বৃদ্ধি পাওয়া একটি সুস্থ বাচ্চার পরিচায়ক। যদি এমন হারে ওজন বাড়তে থাকে তবে বুঝে নেয়া যায় বাচ্চা পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে।
হ্যালো! কান্না মানেই ক্ষুধা নয়!
গবেষণায় দেখা গেছে, একটি শিশু গড়ে দিনে ২-৩ ঘণ্টা কাঁদতে পারে। অনেক সময় মা মনে করেন দুধ কম পাচ্ছে বলে শিশু কাঁদছে। কিন্তু কারণ সবসময় তা নাও হতে পারে!
ডায়াপার ভেজা থাকা বা অতিরিক্ত গরম/ঠান্ডা তার কান্নার কারণ।
আশপাশের প্রচণ্ড শব্দ বা আলোর ঝলকানি তার কান্নার কারণ।
নবজাতক তার মায়ের হৃৎস্পন্দন এবং ঘ্রাণ অনুভব করতে চায়। স্কিন টু স্কিন কনটাক্ট চায়। এটাও তার কান্নার কারণ।
#দুধ খাওয়াবার সময় বোঝা যায় পর্যাপ্ত দুধ পাচ্ছে কি-না?
হ্যাঁ।
ক. চোয়ালের নড়াচড়া ও চোষার ধরন দেখে
শিশু যখন দুধ টেনে নেয়, তখন তার চিবুক বা চোয়ালের নড়াচড়া খেয়াল করতে হবে।
শিশু যখন মুখ ভরে দুধ পায়, তখন সে বড় করে মুখ খোলে, একটু থামে (Pause) এবং তারপর মুখ বন্ধ করে। এই যে মাঝখানের বিরতি বা পজ, এটাই প্রমাণ করে যে তার মুখে দুধ এসেছে এবং সে তা গিলেছে।
যদি শিশু শুধু দ্রুত ছোট ছোট করে চোষে (Quick, shallow sucks) এবং কোনো বিরতি না নেয়, তবে বুঝতে হবে সে কেবল নিপল চুষছে, কিন্তু পর্যাপ্ত দুধ তার মুখে আসছে না।
খ. দুধ গেলার শব্দ খেয়াল করে
ঘর যখন শান্ত থাকে, তখন শিশুর দুধ গেলার একটি মৃদু শব্দ শোনা যায় (অনেকটা 'ক্লিক' বা 'গাট' শব্দের মতো)।
একে বলা হয় Nutritive Sucking। শিশু প্রতি ২-৩ বার চোষার পর একবার বড় করে ঢোক গিলবে। এটিই সবচেয়ে বড় প্রমাণ যে দুধ শিশুর পেটে যাচ্ছে।
গ. শিশুর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে
দুধ খাওয়া শুরু করার সময় এবং শেষ করার সময় শিশুর বডি ল্যাঙ্গুয়েজের দিকে খেয়াল করা যেতে পারে।
শুরুর দিকে: বাচ্চা ক্ষুধার্ত থাকলে তার হাতের মুঠি শক্ত থাকে, শরীর টানটান থাকে এবং সে খুব অস্থির হয়ে চোষে।
পর্যাপ্ত দুধ পাওয়ার পর: বাচ্চা যখন তৃপ্ত হয়, তার হাতের মুঠি ধীরে ধীরে আলগা হয়ে যায়, শরীর রিল্যাক্সড হয়ে আসে এবং সে নিজে থেকেই দুধ ছেড়ে দেয়। অনেক সময় শিশু তৃপ্তির ঘুমে তলিয়ে যায়। টানা ১.৫-২ ঘন্টা শান্ত হয়ে ঘুমাতে পারছে।
যখন জেগে থাকছে হাত-পা নাড়াচ্ছে ও চোখ মেলে তাকাচ্ছে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা। যদি শিশু দুধ খাওয়ার সময় গালের ভেতরে গর্ত তৈরি হয় (Dimpling) বা চপ-চপ শব্দ হয়, তবে বুঝতে হবে বাচ্চার 'ল্যাচিং' বা মুখ লাগানোর পজিশন ঠিক নেই। সেক্ষেত্রে সে অনেকক্ষণ ধরে চুষলেও পেট ভরবে না এবং মা ব্যথা পেতে পারেন।
মনে রাখতে হবে, নবজাতকের পাকস্থলীর আকার প্রথম দিনে একটি মার্বেলের মতো (৫-৭ মিলি), ৩য় দিনে পিং পং বলের মতো (২২-২৭ মিলি) এবং ১০ম দিনে একটি বড় ডিমের মতো (৬০-৮০ মিলি)। তাই প্রথম দিকে বাচ্চা অল্প অল্প করে ঘন ঘন দুধ খাবে এটিই স্বাভাবিক।
(Reference : WHO, UNICEF, CDC, APA Guidelines)
'নতুন শিশুর মা-বাবা যা জানতে চায়' সিরিজের দ্বিতীয় লেখা এটি।
ডা. মারুফ রায়হান খান
৩৯ তম বিসিএসের চিকিৎসক
মুগদা মেডিকেল কলেজ হসপিটাল