19/10/2026
ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর খাবার
সারা দেশে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় মানুষের মনে দেখা দিচ্ছে আতঙ্ক। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্লাটিলেট কমে যাওয়া। এ ছাড়া তীব্র মাথাব্যথা, মাংসপেশি ও চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরে লালচে র্যাশ উঠতে পারে।
ডেঙ্গু কি?
ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এই ভাইরাসের চার ধরনের সেরোটাইপ (serotype) থাকে। এডিস মশার মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ায়। মশা কামড়ানোর (৪-১০) দিনের মধ্যে এই ভাইরাস দেহে বংশবৃদ্ধি করে রোগের সৃষ্টি করে। সাধারণত আমাদের রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ থাকে দেড় লক্ষ থেকে চার লক্ষের মধ্যে। ডেঙ্গুর তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে অনেক সময় এই প্লাটিলেটের পরিমাণও কমতে থাকে।
ডেঙ্গু জ্বর যেহেতু ভাইরাসজনিত রোগ, যা মশার মাধ্যমে ছড়ায়, তাই ডেঙ্গু রোগীদের দ্রুত সুস্থতা নিশ্চিত করতে সুষম খাবার ও পুষ্টির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে, যা আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। এই সময় রোগীর শরীর দুর্বল হয়ে যায় এবং প্রচুর পানি ও পুষ্টিকর খাবারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তাই রোগীর সঠিক যত্ন ও দ্রুত সুস্থতার পাশপাশি ডেঙ্গু রোগীর খাবার চার্ট বা একটি সুষম খাবার তালিকা প্রয়োজন।
ডেঙ্গু রোগীর পুষ্টির প্রয়োজনীয়তা:
ডেঙ্গু রোগীদের শরীরে শক্তি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ফলে তাদের পুষ্টির চাহিদা বৃদ্ধি পায়। ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে সঠিক পুষ্টির জন্য তিনটি মূল বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:
শক্তি বাড়ানো: রোগীর শরীরে শক্তি পুনরুদ্ধারের জন্য প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন মাছ, মুরগির মাংস, চর্বিহীন লাল মাংস (গরু, ছাগল), ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্যে প্রোটিন বেশি থাকে।
ভিটামিন ও মিনারেলস: ভিটামিন সি, ভিটামিন ডি এবং আয়রন সমৃদ্ধ খাবার রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। ফল, শাকসবজি এবং দানাদার খাবার এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
✅ ভিটামিন-সি: একটি কার্যকারী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা কোলাজেন উৎপাদনে সহায়তা করে এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ভিটামিন-সি জাতীয় খাবার রক্তে প্লাটিলেটের সংখ্যা স্বাভাবিক রাখতেও কার্যকর। কমলা, মাল্টা, আপেল, পেয়ারা, আমড়া, পেঁপে, আম, আনারস, আঙুর, জাম ইত্যাদি ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-সি আছে। ডেঙ্গু রোগীকে প্রতিদিন এই ফলগুলো পরিমিত পরিমাণে খাওয়াতে হবে।
✅ আয়রন ও ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ খাবার: মাছ, মাংস, ডিম, কলিজা, ডাল, বাদাম, ড্রাই ফ্রুটস, খেজুর ইত্যাদি থেকে আয়রন পাওয়া যায়। রক্তের হিমোগ্লোবিন বাড়াতে, রক্তক্ষরণ রোধে ও প্লাটিলেট গঠনের জন্য অপরিহার্য খনিজ উপাদান হলো আয়রন। শরীরে আয়রন শোষণ বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন সি।
✅ ভিটামিন-কে সমৃদ্ধ খাবার: ভিটামিন-কে রক্ত জমাট বাঁধার জন্য অপরিহার্য, ডেঙ্গুর সময় প্লাটিলেটের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। ব্রকলি, স্প্রাউট এবং গাঢ় সবুজ শাক-সবজি ভিটামিন কে-এর ভালো উৎস।
✅ ভিটামিন-বি ১২: ভিটামিন বি-১২ এর অন্যতম উৎস ডিম, দুধ, মাখন, পনির, কম চর্বিযুক্ত দই।
ডেঙ্গু রোগীদের প্লাটিলেট কমে যায়। এ জন্য কিছু খাবার উপকারী। যেমন পালংশাক, ছোলা, মসুর ডাল, ডালিম, কচুশাক, মিষ্টিকুমড়া, কালো আঙুর, তিসির তেল, কলমি শাক ইত্যাদি।
✅তরল পদার্থ: ডেঙ্গু রোগীদের পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে রোগীকে প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন লিটার পানি পান করতে হবে। পাশাপাশি শরীরে পানির পরিমাণ ঠিক রাখতে ডাবের পানি ও বিভিন্ন ধরনের ফলের রস উপকারী। এ ছাড়া নরম সেদ্ধ জাউ ভাত, খিচুড়ি, বিভিন্ন ধরনের স্যুপ খেতে দিতে হবে। প্রয়োজন বুঝে ডেঙ্গু রোগীকে ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশনও (ওআরসি) দেওয়া যেতে পারে। যেন শরীর হাইড্রেটেড থাকে। এ ছাড়াও আদা-পানি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীদের এই রোগের প্রভাব দূর করতে প্রয়োজন। আদা-পানি এ সময়ের বমি বমি ভাব হ্রাস করতে সাহায্য করতে পারে।
এ ছাড়া ডেঙ্গুতে প্রায়শই ডিহাইড্রেশন হতে পারে এবং ডাবের পানি শরীরের তরল মাত্রা নিয়ন্ত্রণের অন্যতম সেরা উপায়।
প্রয়োজনীয় খনিজ, ইলেক্ট্রোলাইট ও পানির প্রাকৃতিক উৎস হওয়ায় নারিকেল পানি ডেঙ্গু রোগীর ডায়েটে অন্তর্ভুক্ত করা খুবই জরুরি।
দুগ্ধজাতীয় খাবার প্রোবায়োটিকসের উৎস। দইয়ে থাকা ল্যাকটোব্যাসিলাস নামক ব্যাকটেরিয়া আমাদের অন্ত্রের উপকার করে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে দুগ্ধজাত খাবার শরীরে পটাশিয়াম, ফসফরাস ও সোডিয়ামের পরিমাণ ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
রুচি থাকে না বলে ডেঙ্গু রোগীরা অনেক সময় অনেক খাবার খেতে পারে না। তাই এ সময় সবজির স্যুপ, চিকেন স্যুপ, ডালের স্যুপ ইত্যাদি খেলে শক্তি পাওয়া যায়। এ ছাড়া প্রচণ্ড জ্বরে মুখের স্বাদ ও গন্ধের পরিবর্তন দেখা দেয়। তাই যেকোনো ভেষজ চা পান করতে পারেন। যেমন পুদিনা চা, এলাচি চা, তুলসী চা, আদা চা ইত্যাদি।
ডেঙ্গু রোগীর দুর্বলতা থাকে। তাই অল্প খেলেও তাৎক্ষণিক শক্তি পাওয়া যায় এমন খাবার খেতে হবে। যেমন দুধ, আলুর তরকারি, ভাত, কিশমিশ, খেজুর ইত্যাদি।
বর্জনীয় খাবার:
❌ অতিরিক্ত তেল–মসলাজাতীয় খাবার পাকস্থলীকে অ্যাসিডিক করে তোলে। ডেঙ্গু রোগীর শরীর দুর্বল থাকে এবং হজমশক্তি কমে যায়। তৈলাক্ত ও ভাজা খাবার হজম করা কঠিন, ফলে এটি আরও দুর্বলতা সৃষ্টি করতে পারে।
❌ ফাস্ট ফুড, ভাজাপোড়া খাবার, কাঁচা সবজি বা কাঁচা খাবার (যেমন সালাদ), অতিরিক্ত শক্ত খাবার ইত্যাদি পরিহার করা উচিত। কারণ ডেঙ্গু জ্বরে হেমোরেজ বা রক্তক্ষরণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
❌ মসলাদার খাবার ডেঙ্গু রোগীদের হজমে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে এবং পেটের সমস্যা বাড়াতে পারে। তাই ডেঙ্গু রোগীদের ক্ষেত্রে মসলা বা ঝাল খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।
❌ কড়া দুধ–চা, কফি, এনার্জি ড্রিংক এসব খাবার শুধু হজমেই অসুবিধা করে না, দ্রুত আরোগ্য লাভের পথেও বাধা প্রদান করে। এ ছাড়া এতে থাকা ক্যাফেইনও ডাইইউরেটিক, যা শরীরকে পানিশূন্য করে। তাই এ সময় এ ধরনের খাবার এড়িয়ে চলাই উত্তম।
ফারজানা ছিমি
ঊর্ধ্বতন প্রশিক্ষক
বারটান আঞ্চলিক কার্যালয়, বরিশাল।
©
#ডেঙ্গু_সতর্কতা #পুষ্টি_দিয়ে_প্রতিরোধ #ডেঙ্গু_রোগীর_খাবার #ডেঙ্গু_নিরাময় #ফলিত_পুষ্টি #ডেঙ্গু_প্রতিরোধ