23/05/2026
গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক (Second Trimester) বা ১৪ থেকে ২৪ সপ্তাহ সময়কালকে বলা হয় "গোল্ডেন পিরিয়ড"।
এই সময়েই সাধারণত গর্ভের সন্তানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি আল্ট্রাসাউন্ড করা হয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় Anomaly Scan (অ্যানোমালি স্ক্যান) বলা হয়।
এই রিপোর্টের ভাষা এবং বিভিন্ন মেডিকেল টার্ম (Term) দেখে অনেকেই ঘাবড়ে যান। আপনার বোঝার সুবিধার্থে রিপোর্টের প্রধান প্রধান বিষয়গুলো সহজ ভাষায় নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
❇️১. শিশুর বৃদ্ধি ও পরিমাপ (Fetal Biometry)
রিপোর্টে কিছু ইংরেজি সংক্ষিপ্ত রূপ (Abbreviations) দিয়ে শিশুর বিভিন্ন অঙ্গের মাপ দেখানো হয়। এগুলো দেখে চিকিৎসকরা বোঝেন শিশুটি সপ্তাহের তুলনায় ঠিকঠাক বাড়ছে কিনা:
✅BPD (Biparietal Diameter): শিশুর মাথার একপাশ থেকে অন্যপাশের দূরত্ব বা চওড়া।
✅HC (Head Circumference): শিশুর মাথার সম্পূর্ণ পরিধি বা গোল বাউন্ডারি।
✅AC (Abdominal Circumference): শিশুর পেটের পরিধি। শিশুর ওজন কেমন হচ্ছে তা মূলত এই মাপ থেকে বোঝা যায়।
✅FL (Femur Length): শিশুর ঊরুর হাড়ের (Thigh bone) দৈর্ঘ্য। এটি শিশুর লম্বায় বৃদ্ধির হিসাব দেয়।
✅EFW (Estimated Fetal Weight): আল্ট্রাসাউন্ডের মাপ অনুযায়ী শিশুর আনুমানিক বর্তমান ওজন (এটি সাধারণত গ্রামে লেখা থাকে)।
❇️২. প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ (Dates & Age)
✅LMP (Last Menstrual Period): আপনার শেষ মাসিকের প্রথম দিন।
✅GA / AUA (Gestational Age / Actual Ultrasound Age): আল্ট্রাসাউন্ডের পরিমাপ অনুযায়ী শিশুর বর্তমান বয়স (যেমন: 18 Weeks 4 Days)।
✅EDD (Expected Date of Delivery): শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার সম্ভাব্য তারিখ। (মনে রাখবেন, প্রথম ত্রৈমাসিকের EDD সবচেয়ে নিখুঁত হয়, তবে দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের ডেটও বেশ গুরুত্বপূর্ণ)।
❇️৩. গর্ভফুল বা প্লাসেন্টার অবস্থান (Placenta)
প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল হলো সেই অঙ্গ যার মাধ্যমে মায়ের শরীর থেকে শিশুর শরীরে রক্ত ও পুষ্টি পৌঁছায়। রিপোর্টে এর অবস্থান এবং পরিপক্বতা উল্লেখ থাকে:
✅Position (অবস্থান): এটি জরায়ুর দেয়ালে কোথায় আটকে আছে তা বোঝায়। যেমন: Anterior (সামনের দিকে), Posterior (পেছনের দিকে), Fundal (জরায়ুর একদম উপরের দিকে)। এগুলো সবই স্বাভাবিক।
✅Placenta Previa / Low-lying Placenta: যদি গর্ভফুলটি জরায়ুর নিচের দিকে বা জরায়ুমুখের (Cervix) কাছাকাছি থাকে, তবে তাকে 'লো-লাইং প্লাসেন্টা' বলে। ২৪ সপ্তাহের দিকে এটি থাকলে ডাক্তাররা বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দেন, কারণ জরায়ু বাড়ার সাথে সাথে এটি অনেক সময় নিজে নিজেই উপরে উঠে যায়।
✅Grade (গ্রেড): প্লাসেন্টার পরিপক্বতা বোঝাতে Grade 0, I, II লেখা হয়। দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে সাধারণত Grade 0 বা I থাকে, যা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
❇️৪. অ্যামনিওটিক ফ্লুইড বা গর্ভস্থ পানি (Amniotic Fluid)
শিশু জরায়ুর ভেতরে যে তরলের মধ্যে ভেসে থাকে, তাকে অ্যামনিওটিক ফ্লুইড বা চলিত ভাষায় "পানির পরিমাণ" বলা হয়। রিপোর্টে এটি দুইভাবে লেখা হতে পারে:
AFI (Amniotic Fluid Index): জরায়ুকে চার ভাগে ভাগ করে পানির পরিমাপ। সাধারণত ৮ থেকে ১৮ বা ২০ সেন্টিমিটার হওয়াকে আদর্শ ধরা হয়।
Adequate: রিপোর্টে যদি শুধু 'Adequate' লেখা থাকে, তার মানে পানির পরিমাণ একদম পর্যাপ্ত ও স্বাভাবিক আছে।
Oligohydramnios: পানির পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকলে এই শব্দ লেখা হয়।
Polyhydramnios: পানির পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকলে এটি লেখা হয়।
❇️৫. শিশুর শারীরিক গঠন পরীক্ষা (Anatomical Survey)
১৪ থেকে ২৪ সপ্তাহের (বিশেষ করে ১৮-২২ সপ্তাহের) স্ক্যানে শিশুর প্রতিটি অঙ্গ নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা হয় কোনো জন্মগত ত্রুটি আছে কিনা দেখার জন্য। রিপোর্টে সাধারণত এই অঙ্গগুলোর পাশে "Normal", "Intact", বা "No obvious congenital anomaly seen" লেখা থাকে।
Cardiac / Heart: শিশুর হার্টবিট বা হৃদস্পন্দন ঠিক আছে কিনা (সাধারণত প্রতি মিনিটে ১২০ থেকে ১৬০ বার বা FHR - 140 bpm এরকম লেখা থাকে)। হার্টের ৪টি চেম্বার বা কক্ষ ঠিক আছে কিনা তাও দেখা হয়।
Brain / Spine: শিশুর মস্তিস্কের গঠন এবং মেরুদণ্ডের হাড়গুলো (Spine) জোড়া লাগানো ও সুরক্ষিত আছে কিনা।
Face: শিশুর ঠোঁট বা তালু কাটা (Cleft lip/palate) আছে কিনা।
Limbs: দুই হাত, দুই পা এবং আঙুলগুলোর গঠন ঠিক আছে কিনা।
Organs: পেট, কিডনি, মূত্রথলি এবং পাকস্থলী ঠিকঠাক তৈরি হয়েছে কিনা।
❇️৬. জরায়ুমুখের দৈর্ঘ্য (Cervical Length)
মায়ের জরায়ুর মুখ (Cervix) কতটা লম্বা বা বন্ধ আছে তা দেখা হয়। অকাল প্রসব বা মিসক্যারিজের ঝুঁকি আছে কিনা তা বুঝতে এটি সাহায্য করে। সাধারণত এটি ৩ সেমি বা ৩০ মিমি (30mm)-এর বেশি হওয়া নিরাপদ। এর চেয়ে কম হলে ডাক্তাররা বিশেষ সতর্কতা বা বিশ্রামের পরামর্শ দেন।
📌 একটি জরুরি নোট:
আশা করি সবার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছেন । তবুও কোন প্রশ্ন থাকলে কমেন্টে লেখেন ।
আল্ট্রাসোগ্রাম রিপোর্টে যদি কোনো মেডিকেল টার্ম নিয়ে আপনার মনে খটকা লাগে, তবে নিজে নিজে দুশ্চিন্তা না করে সরাসরি আপনার গাইনোকোলজিস্ট বা সনোলজিস্টের (যিনি আল্ট্রাসাউন্ড করেছেন) সাথে কথা বলুন। গর্ভাবস্থার এই সময়ে নিয়মিত চেকআপ এবং ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলাই মা ও শিশুর সুস্থতার চাবিকাঠি।
~ ডা. ফাহমিদা মাহবুবা ~