27/05/2026
এক জায়গায় হিসেব দেখলাম যে কুরবানির ঈদ উপলক্ষে এবছর বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ১০ লক্ষ পশু জ*বাই করা হবে। এর মধ্যে ৫০ লক্ষ গরু-মহিষ আর ৬০ লক্ষ ছাগল-ভেড়া। গরু প্রতি ৭৫ হাজার টাকা আর ছাগল ও ভেড়া প্রতি ১২ হাজার টাকা হিসেবে মোট প্রায় ৪০,৫০০ কোটি টাকা খরচ হবে, যার সমমূল্য প্রায় ৩৭৫ কোটি মার্কিন ডলার।
তাদের প্রস্তাবনা হল এই বিশাল অঙ্কের টাকাটা কুরবানির পেছনে খরচ না করে দেশের ৮০ লক্ষ সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের মাঝে বিতরণ করে দিলে পরিবারপ্রতি প্রায় ৫০ হাজার টাকা করে পেতে পারতো। ফলে পুনর্বাসন, স্বাস্থ্য কিংবা উন্নয়নমূলক কোন খাতে টাকাটা ব্যয় হতো আর ফলস্বরূপ দেশের জন্য আরো উত্তম কিছু হত।
দেশ ও দেশের মানুষের উন্নতির জন্য তাদের এরূপ প্রস্তাবনা দেখে আমারও ভালো লাগলো। বস্তুত কুরবানি ও হজ্জ নিয়ে এধরণের প্রস্তাবনা অনেকের মাথাতেই ঘুরপাক খায়। কেউ বলে, অনেকেই বলে না। তাই আমি একটি সরল হিসেব দিতে এই লেখাটি লিখছি। এখানে আমি উপরের উপাত্তগুলোই ব্যবহার করবো যেন প্রস্তাবনা প্রদানকারীদের পরবর্তীতে হিসেব করতে আরো সুবিধা হয়।
১.
প্রথমেই একটি প্রশ্ন করিঃ কুরবানির ঈদে পশু কেনা-বেচার কারণে যে ৩৭০ কোটি মার্কিন ডলার হাতবদল হবে সেটা কি কালোটাকা না সাদাটাকা?
এর অধিকাংশই সাদাটাকা। প্রতিটি পশু হাট থেকে কেনার সময় দামের ৫ থেকে ৬ শতাংশ টাকা হাসিল হিসেবে সরকারি খাতে চলে গেছে আর বাকি টাকা পশু বিক্রেতাদের হাতে গেছে। এরা অধিকাংশই এদেশের প্রান্তিক মানুষ। মানে ৩৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ৯৫ শতাংশ, অর্থাৎ ৩৫২ কোটি মার্কিন ডলার মাত্র এক সপ্তাহে এদেশের প্রান্তিক মানুষদের হাতে পোঁছে গেছে এক কুরবানির ঈদ উপলক্ষে।
কতগুলো পরিবারে এই টাকা পৌঁছে যাচ্ছে তার কোন ধারণা আছে আপনাদের? ধরে নিলাম, প্রতিটি প্রান্তিক পরিবার ৪৫ হাজার টাকা করে হাতে পেল। অর্থাৎ এদেশের ৯০ লক্ষ প্রান্তিক পরিবারের হাতে মাত্র এক সপ্তাহে ৪৫ হাজার করে টাকা পৌঁছে গেল কুরবানির ঈদ উপলক্ষে।
টাকা যখন হাতবদল হয় তখন অর্থনীতির পরিভাষায় সেটাকে Circulation of Money বলে। Circulation of Money প্রবৃদ্ধির একটা সূচক। আপনাদের হিসেব দেখলে সাদাচোখে মনে হয় ৩৭০ কোটি মার্কিন ডলার শুধু শুধু পানিতে ফেলা হল, আর বিনিময়ে কিছু পশু হত্যা করা হল। ব্যাস!
এবার আপনাদের প্রস্তাবনায় ফিরে যাই। ৩৭০ কোটি মার্কিন ডলার দেশের ৫০ লক্ষ পশ্চাৎপদ পরিবারের মাঝে বিতরণ করতে চান আপনারা।
– কীভাবে করবেন?
– কাকে দায়িত্ব দেবেন?
– কাকে বিশ্বাস করতে পারবেন যে পাওনা টাকাগুলো প্রাপ্যহাতে এক সপ্তাহে যথাযথভাবে পৌঁছে যাবে?
২.
কুরবানির মাংসের এক-তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে আর এক-তৃতীয়াংশ দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা হয়। অর্থাৎ ২৫০ কোটি মার্কিন ডলার সমমূল্যের খাবার বিতরণ করা হচ্ছে এই একদিনে। কুরবানির উপলক্ষ ছাড়া অন্য কোন উপায়ে এটার একটি বিকল্প বলে দেখান তো!
শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো পৃথিবীতে এই একদিন উপলক্ষে যে পরিমাণ খাবার (মাংস) বিতরণ করা হয়, সেটির সেক্যুলার একটি বিকল্প কেউ বলতে পারবেন আমাকে?
৩.
পশু ক্রয় বিক্রয়ের জন্য পরিবহনের ব্যবসা, হাটের সাথে সম্পর্কিত ব্যবসা এবং আরো অনেকের কর্মসংস্থান, চামড়ার ব্যবসা, হাঁড় ও শিং দ্রব্যের ব্যবসা, গোস্ত কাটার সরঞ্জামের ব্যবসা, পশুর খাদ্যের সাথে সম্পর্কিত মানুষের জীবিকার হিসাব করলে এই অংক আরো অনেক বড় হবে। যা আপনাদের বোঝার বাইরে তাই টা দিলাম না।
৪.
কুরবানির মাংস তো মুসলমানরা একা খায় না, অপরকে কিছু অংশ দিয়ে তারপর খায়।
– টাকার হিসেব যদি করবেনই তাহলে প্রতি বছর পয়লা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ না খেয়ে সেই টাকাটা মানুষকে দিয়ে দেবার দাবি করেন না কেনো?
– কালোটাকার হিসেব চেয়ে প্রতিবাদ করেন না কেনো?
এগুলোর কোনটিই আপনারা করেন না, কখনও করবেনও না, কারণ আল্লাহ’র পুলিশ-থানা-হাজত-জেলের সরঞ্জাম নেই। তবে যে সরঞ্জাম আছে, আশা করি তা সময় হলেই দেখা যাবে। নেত্রবিস্ফারিত করে দেখে নিয়েন।
সবশেষে বলবো, আসুন সকলে যথাযথ পবিত্রতার সহিত আল্লাহর বিধান পশু কোরবানি পালন করি। মনে রাখবেন, এই কোরবানি ঈদের উসিলায় অনেক পরিবার বছরে একটি দিন গরু খাসির গোশত খেতে পারে।
সংগৃহিত