04/05/2026
রাজনগরে কমিউনিটি ক্লিনিকে তীব্র ঔষধ সংকট
খালি হাতে ফিরছেন রোগীরা, বিপর্যস্ত তৃণমূল স্বাস্থ্যসেবা
মৌলভীবাজার টাইমস্:
মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার গ্রামীণ জনপদের প্রধান ভরসা কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলা ঔষধ সংকট বর্তমানে চরম আকার ধারণ করেছে। সরকারিভাবে বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ঔষধ সরবরাহের কথা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ ক্লিনিক কার্যত ঔষধশূন্য হয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিদিনই চিকিৎসা নিতে এসে খালি হাতে ফিরছেন রোগীরা।
উপজেলায় মোট ২৫টি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এর মধ্যে মাত্র এক-দুটি ক্লিনিকে সীমিত পরিসরে কিছু ঔষধ পাওয়া যাচ্ছে। বাকি ক্লিনিকগুলোতে জ্বর ও ব্যথার প্যারাসিটামল, গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ, খাবার স্যালাইন, এমনকি শিশুদের সর্দি-কাশির সিরাপের মতো মৌলিক ঔষধও দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত।
সরেজমিনে বিভিন্ন ক্লিনিক ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিন রোগীদের দীর্ঘ সারি থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশন দিয়ে বাইরে থেকে ঔষধ সংগ্রহের পরামর্শ দিচ্ছেন। এতে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন।
বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য এই সংকট আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ক্লিনিকে এসেও প্রয়োজনীয় ঔষধ না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন তারা।
নিদনপুর কমিউনিটি ক্লিনিকসহ উপজেলার বিভিন্ন ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, গত প্রায় চার মাস ধরে কার্যত কোনো ঔষধ সরবরাহ নেই। এতে সেবাদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি প্রায় সাড়ে পাঁচ মাসের বেতন বকেয়া থাকায় তারা আর্থিক ও মানসিক চাপে রয়েছেন।
রাজনগর উপজেলা সিএইচসিপি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আমজদ হোসেন চৌধুরী বলেন,দীর্ঘদিন ধরে ক্লিনিকে কোনো ঔষধ নেই। প্রতিদিন বহু মানুষ আসে, কিন্তু ওষুধ দিতে না পেরে তাদের ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। নিদনপুর ক্লিনিকের ওপর প্রায় ১০টি গ্রামের মানুষ নির্ভরশীল। চার মাস ধরে এ পরিস্থিতি চলায় আমরা স্বাভাবিকভাবে সেবা দিতে পারছি না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে; তারা দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।
নিদনপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট (এফডব্লিউএ) ফাতিমা বেগম বলেন,গর্ভবতী নারীসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের রোগীরা এখানে আসেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় ঔষধ না থাকায় অনেককে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠাতে হয়। খারাপ সড়ক ও আর্থিক সংকটের কারণে অনেকের পক্ষে সেখানে যাওয়া সম্ভব হয় না।
ভুক্তভোগী রোগী নিদনপুর গ্রামের বাসিন্দা ফাতিহা বেগম বলেন,আমি দীর্ঘদিন ধরে আলসারের রোগী। নিয়মিত ওষুধ কেনার সামর্থ্য নেই। চার মাস ধরে ক্লিনিকে এসে কোনো ঔষুধ পাইনি। সরকারি ক্লিনিক থেকেও যদি না পাই, তাহলে আমরা কোথায় যাব?
স্থানীয় ঈমাম আব্দুন নুর বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এখানে ঔষধের সংকট চলছে। আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষ এ ক্লিনিকের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ওষুধ না পেয়ে তারা ফিরে যাচ্ছে। দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।”
উপজেলার ক্লিনিক কাঠামো অনুযায়ী ফতেপুর ইউনিয়নে ২টি, উত্তরভাগে ৪টি, মুন্সিবাজারে ৪টি, পাঁচগাঁওয়ে ৩টি, রাজনগর ইউনিয়নে ৩টি, টেংরায় ৩টি, কামারচাকে ৩টি এবং মনসুরনগরে ৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, জনসংখ্যার তুলনায় ঔষধের বরাদ্দ কম হওয়া, সরবরাহ ব্যবস্থায় বিলম্ব এবং সমন্বয়হীনতার কারণেই এ সংকট তীব্র হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহল অবিলম্বে এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, জনসংখ্যা অনুযায়ী ঔষধ বরাদ্দ বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, নিয়মিত তদারকি জোরদার এবং মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের বকেয়া বেতন পরিশোধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
এ বিষয়ে রাজনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা উৎপল দাশ বলেন, বর্তমানে ওষুধের সরবরাহ কম থাকায় সব ক্লিনিকে পর্যাপ্ত ঔষুধ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আমরা চাহিদা পাঠিয়েছি। পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়া গেলে সংকট দূর হবে।
তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বর্তমানে ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজনগরের সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘবে দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।