23/09/2026
স্মৃতির পাতা সাদা হলেও, অনুভূতির রঙ ফুরোয় না
শারমিন আলম ,UK
মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য আমরা শব্দ, বাক্য, স্পর্শ, আবেগ আর কত কী-ই না ব্যবহার করি। এই সবের সাহায্যেই বন্ধুত্বের শুরু হয়। কিন্তু যেটাকে দেখা যায় না, শোনা যায় না, ধরা-ছোঁয়ার বাইরে, এমন কিছুর বন্ধু হওয়া খুবই স্পেশাল একটা ব্যাপার, তাই না? এমনই এক অপ্রত্যাশিত সম্পর্কের সূচনা, যার শুধু ভবিষ্যৎ নয়, বর্তমানটাও অজানা; কিন্তু শক্ত করে হাত ধরে চলছি আমরা—সাথী হয়ে, সন্তান হয়ে, ভাই অথবা বোন হয়ে, কখনো বা বাবা, কখনো মা হয়ে। ডিমেনশিয়ার বন্ধু আমরা, পথ চলছি একজন আরেকজনের হয়ে।
এই পথ চলার মাঝে বুঝতে পেরেছি যে, একমাত্র অতীতই আছে যা অক্ষত, আমাদের বন্ধুত্বের অস্তিত্ব সেখান থেকেই শুরু। সেই তিন সিলেবল শেখার বয়সেই শিখে গিয়েছিলাম ব্যাকটেরিয়ার নাম স্ট্যাফিলোকক্কাস অরিয়াস"(Staphylococcus Aureus")আমার মায়ের পিএইচডি থিসিসের অন্যতম এক চরিত্র ছিল সেটা। স্কুল শেষে আমার অসংখ্য বিকেলবেলার স্মৃতি আমার মায়ের ল্যাবরেটরিতে, মাইক্রোস্কোপের নিচে হাত রেখে। শাড়ির আঁচলে কোরমা-পোলাওয়ের সুবাস আর সুরেলা গলায় কুরআন তেলাওয়াতের ধ্বনি আজও ঘর জুড়ে আছে আমাদের। আমার বাবার চোখের পলকে আর দীর্ঘনিশ্বাসে, তাঁর অক্লান্ত চেষ্টায় আর অবিরাম ভালোবাসার মাঝে আমার মায়ের সুদূর ভবিষ্যৎ।
বর্তমানটা তবে বেশ ভিন্ন—স্মৃতির পাহাড়, পাহাড়ের পরে মেঘ, বৃষ্টি, রংধনু, সবই আমার একার। আমার মায়ের স্মৃতির পাতাগুলো সব ডিমেনশিয়ায় ধোয়া; কখনো সাদা, কখনো পানির মতো স্বচ্ছ, আমি যা বলি তাই। তবে ডিমেনশিয়ার বন্ধুরা, আমরা এটা জানি যে স্মৃতির পাতাগুলো সাদা হয়ে গেলেও অনুভূতিগুলো এখনো আছে—কখনো চোখের চমকানিতে বা নরম হাতের ছোঁয়ায় সেই অনুভূতি পাওয়া যায়। মানুষটার স্মৃতি হারিয়ে গেলেও তাঁর অস্তিত্ব তো আছে।
এই তো সেদিনই পাশের বাড়ির আন্টি আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন, "তোমার মায়ের একটু মেন্টাল সমস্যা আছে, তাই না?" আমি বললাম, "আন্টি, মেমোরি আর মেন্টাল অবস্থা দুটো আলাদা জিনিস। আম্মুর মেন্টাল স্ট্যাটাস হয়তো আমাদের থেকেও ভালো, শুধু মেমোরিতে সমস্যা আছে। যেমন অনেকের কিডনি বা হার্টে সমস্যা থাকে, তাঁদের তো আমরা মেন্টাল বলি না, তাই না?" আন্টি একটু লজ্জা পেলেন; তবে আমি জানি আন্টিরও দোষ নেই—ডিমেনশিয়া নিয়ে অনেকেরই অনেক ভুল ধারণা আছে।
একবার গিয়েছিলাম আম্মুর চোখের পাওয়ার টেস্ট করতে ঢাকার খুব পপুলার একটা হাসপাতালে। আমি রিসিভশনিস্ট, অ্যাসিস্ট্যান্ট, ডাক্তার—সবাইকে বলছিলাম যে উনার ডিমেনশিয়া আছে, একটু কেয়ার নিতে হবে। খুব তাড়াতাড়িই বুঝতে পারলাম, ডাক্তার আই স্পেশালিস্ট হলেও উনার ডিমেনশিয়ার পেশেন্ট ডিল করার কোনো অভিজ্ঞতা নেই; তাই উনাকে থামিয়ে দিলাম। স্পেশালিস্টের সাথে দুজন ট্রেইনি ডাক্তার ছিলেন, উনাদের প্রচণ্ড কৌতূহল—"আপনার আম্মুর কি পাস্টে কোনো ট্রমা ছিল?" আমি মিষ্টি করে বললাম, "আপু, আমার আম্মু তো আমার ইন্টার্নশিপের প্রজেক্ট না, তাই আমি এটা নিয়ে ডিসকাস করতে চাচ্ছি না।"
এরকম অসংখ্য বাস্তবতা আর সংঘর্ষের মধ্য দিয়েই ডিমেনশিয়ার বন্ধুদের পথচলা। তবে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, আপনজনদের অস্তিত্ব তাঁদের স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়।