01/08/2026
মহামারী জয়ে হোমিওপ্রফাইল্যাক্সিস: তথ্য, বিজ্ঞান ও একটি সফল ট্রায়ালের গল্প
পর্ব-১
কিউবার ২৩ লক্ষ মানুষের সেই অবিশ্বাস্য ইতিহাস।
২০২০ সালের আগস্ট মাসের কথা। বিশ্বজুড়ে তখন করোনাভাইরাসের ভয়াল থাবা। চারদিকে আতঙ্ক ও অচলাবস্থা। সংক্রামিত হওয়ার ভয়ে অনেক হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা থমকে গিয়েছিল, বহু চিকিৎসক তখন চেম্বারে বসতে বা ঘর থেকে বের হতেও ইতস্তত করছিলেন। পুরো দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম।
ঠিক তার আগের বছর, অর্থাৎ ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ভয়াল রূপ আমরা দেখেছিলাম। সরকারি তথ্যমতে, সে বছর ১ লক্ষ ১ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ১৬৪ জন মারা যান। ২০২০-এর সেই কঠিন সময়ে আমার মনে একটাই দুশ্চিন্তা জাগছিল, ভাগ্যক্রমে তখন ডেঙ্গু বা চিকনগুনিয়ার প্রকোপ কিছুটা কম থাকলেও, এই করোনার প্রাদুর্ভাবের মধ্যে যদি আবার গত বছরের মতো ডেঙ্গু বা চিকনগুনিয়া হানা দেয়, তবে কী হবে?
একজন রেজিস্টার্ড হোমিও ডাক্তার হিসেবে কেবল হাত গুটিয়ে বসে থাকা সম্ভব ছিল না। ভাবলাম, শুধু করোনা নয়- যদি করোনা, ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া তিনটির জন্যই একটি সমন্বিত ‘হোমিওপ্রফাইল্যাক্সিস’ তৈরি করা যায়, তবে তা মানুষের জন্য এক বিরাট সুরক্ষাকবচ হতে পারে।
এই সাহসী ও কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আমার সবচেয়ে বড় প্রেরণা এসেছিল হাজার হাজার মাইল দূরের দেশ কিউবা থেকে।
সেই সত্য ইতিহাস, যা প্রমাণ করে মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হোমিওপ্রফাইল্যাক্সিস কোনো অলৌকিক কিছু নয়, বরং এক বিজ্ঞানভিত্তিক ও শক্তিশালী হাতিয়ার।
ক্যাটাগরি-৪ ঝড় এবং এক মরণঘাতী প্রাদুর্ভাবঃ
২০০৭ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাস। কিউবায় পরপর দুটি ভয়াবহ ক্যাটাগরি-৪ ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। বন্যা ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে ছড়িয়ে পড়ে লেপ্টোস্পাইরোসিস (Leptospirosis) নামক মরণঘাতী মহামারী। আক্রান্ত ব্যক্তিদের রক্তবমি, জন্ডিস এবং কিডনি বিকল হয়ে প্রাণ হারাচ্ছিল শত শত মানুষ।
ঝুঁকিপূর্ণ তিন অঞ্চলে প্রায় ২৩ লক্ষ মানুষ সরাসরি মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়ে। কিন্তু বড় সমস্যা ছিল-
১. দ্রুততম সময়ে এত বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য প্রস্তুত বা কেনা সম্ভব এমন কোনো ভ্যাকসিন বাজারে ছিল না।
২. নতুন ভ্যাকসিন তৈরি বা আমদানির মতো বিপুল অর্থ ও সময় কিউবা সরকারের হাতে ছিল না।
বিজ্ঞানীরা তখন নিলেন এক সাহসী বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় কিউবার শীর্ষ বায়োটেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Finlay Institute-এর অনাক্রম্যবিজ্ঞানী (Immunologist) ও চিকিৎসকরা এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। তারা নির্দিষ্ট সেই ব্যাকটেরিয়া থেকে প্রস্তুত করেন একটি বিশেষ হোমিওপ্রফাইল্যাক্সিস ফর্মুলেশন।
অত্যন্ত স্বল্প খরচে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কিউবা সরকার সেই ২৩ লক্ষ উচ্চ ঝুঁকিযুক্ত মানুষের দ্বারে দ্বারে প্রফাইল্যাক্সিস পৌঁছে দেয়।
ফলাফল: চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান
যা ঘটেছিল, তা বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের স্তম্ভিত করে দেয়।
সংক্রমণে ধস: প্রফাইল্যাক্সিস সেবনের মাত্র ২ সপ্তাহের মধ্যে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা অবিশ্বাস্য হারে কমে আসে।
মৃত্যুহার শূন্যে: যে অঞ্চলে প্রতি বছর বহু মানুষ মারা যেত, সেখানে মৃত্যুর সংখ্যা শূন্যে নেমে আসে।
তুলনামূলক প্রমাণ: যে এলাকাগুলোতে এই হোমিও প্রফাইল্যাক্সিস দেওয়া হয়নি, সেখানে সংক্রমণের হার ছিল আগের মতোই স্বাভাবিক চড়া। অর্থাৎ, এই সাফল্য কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না।
কোভিড-১৯ মোকাবেলায় কিউবার ‘Prevengho-Vir’
এমনকি পরবর্তীতে ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়লে কিউবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাদের দেশের প্রবীণ ও ঝুঁকিপূর্ণ নাগরিকদের ইমিউন সিস্টেম বুস্ট করার জন্য Prevengho-Vir নামক একটি হোমিওপ্রফাইল্যাক্সিস বিতরণ করেছিল।
এটি কোনো একক ওষুধ ছিল না, বরং কয়েকটি হোমিও ওষুধের সুনির্দিষ্ট সমন্বয়ে (Combination) তৈরি একটি প্রিপারেশন ছিল—যার মধ্যে Anas Barbariae, Grippe, Bacillinum, Pneumococcinum, Pyrogenium Influenzinum সহ বিভিন্ন পোটেনটাইজড নোসোড ও রেমেডি যুক্ত ছিল। এই সমন্বিত ফর্মুলাটি শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস প্রতিরোধ এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিল।
কেন এই ইতিহাস আমার জন্য অনুপ্রেরণা ছিল?
কিউবার এই ইতিহাস প্রমাণ করে- সংকটকালে যখন সাধারণ চিকিৎসা ব্যবস্থা থমকে যায়, তখন সঠিক পদ্ধতিতে প্রয়োগকৃত হোমিওপ্রফাইল্যাক্সিস হতে পারে দ্রুত, নিরাপদ ও অত্যন্ত কার্যকর এক সমাধান।
ডাক্তারদের চেম্বারে বসা বা বের হওয়ার সেই ভয়াবহ সংকটের দিনগুলোতে কিউবার এই বৈজ্ঞানিক ইতিহাসই আমাকে সাহস জুগিয়েছিল করোনা, ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়ার সমন্বিত প্রফাইল্যাক্সিস নিয়ে মাঠে নামতে।
(চলবে...)
পরবর্তী পর্বে পড়ুন (পর্ব-২): যেকোনো মহামারী বা প্যানডেমিক মোকাবেলায় হোমিওপ্রফাইল্যাক্সিস কোন কোন বৈজ্ঞানিক মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়? Genus Epidemicus (জিনাস এপিডেমিকাস)-এর রহস্য কী?
==================
Dr. Shahidul Islam (Mukul)
Registered Homeopath
Chamber: Doctors' Point
Monsurabad, Adabor, Dhaka.
Phone & WhatsApp: +88 01711 545095