27/09/2026
প্রথম খণ্ড
《 আগমন 》
আজ দুপুরে আপনি হয়তো এক বাটি দই খেয়েছেন।
খেতে খেতে হয়তো মোবাইল দেখছিলেন, কিংবা কারো সাথে গল্প করছিলেন। দইটা ঠান্ডা ছিল, একটু টক, একটু মিষ্টি। শেষ চামচটা মুখে দিয়ে বাটিটা সরিয়ে রেখেছেন, আর ব্যাপারটা ভুলেও গেছেন।
কিন্তু আপনি জানেন না, ঠিক সেই মুহূর্তে আপনার ভেতরে একটা মহাযাত্রা শুরু হয়ে গেছে।
এ গল্প সেই যাত্রার। আর এ গল্পের নায়ক এত ছোট যে আপনার চোখের এক পলকে তার মতো হাজারটা লুকিয়ে থাকতে পারে।
✦ ✦ ✦
তার নাম নাবিল।
নাবিল একটা ব্যাকটেরিয়া। "ব্যাকটেরিয়া" শুনলেই আমরা নাক কুঁচকাই, জীবাণু, রোগ, ময়লা। কিন্তু নাবিল সেই দলের নয়। নাবিল ভালো ব্যাকটেরিয়া। দুধকে দই বানায় যারা, নাবিল তাদেরই একজন। আপনার দইয়ের ওই মিষ্টি-টক স্বাদ, ওটা নাবিলদের হাতের কাজ।
এক বাটি দইয়ে নাবিলের মতো কত জন থাকে জানেন? পৃথিবীতে যত মানুষ আছে, তার চেয়েও বেশি। এক বাটিতে একটা গোটা পৃথিবী!
সেদিন দুপুরে নাবিল তার লক্ষ-কোটি ভাই-বোনের সাথে দইয়ের ঠান্ডা, সাদা জগতে আরাম করে ভাসছিল। হঠাৎ ওপর থেকে নেমে এল বিশাল এক রুপালি আকাশ।
চামচ।
এক ঝটকায় নাবিলের গোটা পৃথিবী উঠে গেল শূন্যে। তারপর অন্ধকার।
✦ ✦ ✦
চোখ মেলে নাবিল প্রথমেই টের পেল গরম।
দইয়ের বাটি ছিল ঠান্ডা, আর এখানে যেন গ্রীষ্মের দুপুর। চারদিকে উঁচু সাদা পাহাড়ের সারি। নিচে লাল, নরম, দুলতে থাকা মাটি। আর সবকিছু ভেজা, পিচ্ছিল।
এটা আপনার মুখ।
ওই সাদা পাহাড়গুলো আপনার দাঁত। নাবিলের চোখে প্রতিটা দাঁত হিমালয়ের চেয়েও উঁচু। আর লাল মাটিটা আপনার জিভ, যেটা এই মুহূর্তেও কাজ করছে, অথচ আপনি টেরও পাচ্ছেন না।
নাবিল অবাক হয়ে দেখল, এখানে কিছুই এলোমেলো নয়। দাঁত পিষছে, জিভ নাড়ছে, লালা ভিজিয়ে দিচ্ছে। কেউ কাউকে নির্দেশ দিচ্ছে না, তবু সবাই ঠিক জানে কখন কী করতে হবে।
তারপর হঠাৎ জিভটা পুরো দলাটাকে ঠেলে দিল পেছনের দিকে।
এখানে একটা ব্যাপার খেয়াল করুন। আপনার গলার পেছনে দুটো পথ পাশাপাশি। একটা যায় পেটে, আরেকটা যায় ফুসফুসে। খাবার ভুল পথে গেলে বিপদ, দম আটকে যেতে পারে। তাই গেলার ঠিক আগের মুহূর্তে একটা ছোট্ট ঢাকনা নিজে থেকেই শ্বাসের পথটা বন্ধ করে দেয়। প্রতিবার। দিনে হাজারবার।
আপনি কি কখনো সেই ঢাকনাকে ধন্যবাদ দিয়েছেন? দেননি। কারণ আপনি জানতেনই না সে আছে। অথচ জন্মের পর থেকে একবারও সে ছুটি নেয়নি।
✦ ✦ ✦
নাবিল এখন নামছে একটা লম্বা, অন্ধকার সুড়ঙ্গ বেয়ে। খাদ্যনালি।
সে ভেবেছিল, পাহাড় থেকে পাথর যেমন গড়িয়ে পড়ে, তেমনই বুঝি পড়ে যাবে। কিন্তু না। সুড়ঙ্গের দেয়াল নিজেই ঢেউ তুলছে, ওপর থেকে নিচে, একটার পর একটা। যেন অনেকগুলো নরম হাত খুব যত্ন করে তাকে নিচে পৌঁছে দিচ্ছে।
মজার কথা হলো, আপনি উল্টো হয়ে মাথা নিচে দিয়ে দাঁড়ালেও খাবার ঠিকই পেটে যাবে। কারণ খাবার পড়ে না, তাকে পৌঁছে দেওয়া হয়।
কয়েক সেকেন্ড পর সুড়ঙ্গের শেষে একটা গোল দরজা খুলল। নাবিল ভেতরে গড়িয়ে পড়ল। দরজাটা আবার শক্ত করে বন্ধ হয়ে গেল।
আর তখনই নাবিল গন্ধটা পেল।
✦ ✦ ✦
তীব্র। ঝাঁঝালো। জ্বালাময়।
এটা আপনার পাকস্থলী, মানে পেট। আর এখানে যে জিনিসটা ফুটছে, সেটা এক ধরনের কড়া অ্যাসিড। কতটা কড়া? গাড়ির ব্যাটারিতে যে অ্যাসিড থাকে, প্রায় তার কাছাকাছি। এত কড়া যে শোনা যায়, লোহার ব্লেড পর্যন্ত এতে ক্ষয়ে যেতে পারে।
এই অ্যাসিড দিয়েই আপনার পেট খাবার গলায়, আর খাবারের সাথে ঢুকে পড়া ক্ষতিকর জীবাণুদের মেরে ফেলে। এটা আপনার শরীরের প্রথম পাহারাদার।
কিন্তু পাহারাদার তো চেনে না কে বন্ধু, কে শত্রু। নাবিলের চারপাশে তার ভাই-বোনেরা একে একে নিস্তেজ হয়ে পড়তে লাগল।
"দইয়ের ভেতরে লুকাও!" কেউ চিৎকার করল।
নাবিল প্রাণপণে দইয়ের দলার একেবারে মাঝখানে গুটিয়ে গেল। দইটা তখন তার ঢাল। বাইরের দিকটা ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে, সাথে হারিয়ে যাচ্ছে কত চেনা মুখ।
ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নাবিল পেটের দেয়ালের দিকে তাকাল। আর তখনই সে এমন একটা জিনিস দেখল, যা এই বিপদের মধ্যেও তাকে থমকে দিল।
যে অ্যাসিড লোহা ক্ষয় করতে পারে, সেই অ্যাসিড তৈরি হচ্ছে এই দেয়াল থেকেই। অথচ দেয়ালের কিছুই হচ্ছে না!
একটু ভাবুন। একটা ঘর, যার দেয়াল দিয়ে আগুন বের হচ্ছে, অথচ ঘরটা পুড়ছে না।
নাবিল কাছ থেকে দেখল, দেয়ালের ওপর একটা মোটা, পিচ্ছিল, স্বচ্ছ চাদর বিছানো। অনেকটা বর্ষাতির মতো। আর চাদরের নিচে দেয়াল নিজেই একটা শান্ত করার রস ছাড়ছে, যা অ্যাসিডকে দেয়ালের গা পর্যন্ত আসতেই দেয় না।
শুধু তাই না। দেয়ালের একেবারে ওপরের কোষগুলো কয়েক দিন পরপর পুরোপুরি বদলে যায়। পুরোনোরা বিদায় নেয়, নতুনরা এসে জায়গা নেয়। মানে, আপনার পেটের ভেতরের দেয়ালটা গত সপ্তাহে যা ছিল, আজ আর তা নেই। নতুন করে গড়া হয়েছে। আপনি ঘুমিয়ে ছিলেন, কাজ করছিলেন, অথচ ভেতরে নিঃশব্দে চলছিল মেরামত।
নাবিল ফিসফিস করে বলল, "আগুন জ্বালাচ্ছে, অথচ নিজের ঘর পুড়ছে না। এ হিসাব কে কষল?"
প্রশ্নটার উত্তর তখন কেউ দিল না। কিন্তু প্রশ্নটা নাবিলের মনে গেঁথে রইল।
✦ ✦ ✦
সময় যেন থেমে গেল। মিনিট গড়িয়ে ঘণ্টা হলো। পেট ধীরে ধীরে মোচড় দিচ্ছে, সব খাবার মিশিয়ে ঘন স্যুপ বানাচ্ছে। নাবিলের ঢাল প্রায় শেষ, শরীরও দুর্বল।
ঠিক যখন মনে হলো আর পারবে না, তখন নিচের দিকে একটা টান অনুভব করল।
পেটের শেষ মাথায় আরেকটা দরজা। এই দরজাটা একটু হিসাবি। সব খাবার একসাথে ছাড়ে না। অল্প অল্প করে, মেপে মেপে সামনে পাঠায়, যাতে পরের জায়গাটার ওপর চাপ না পড়ে। দরজাটা খুলল, আর এক ঝলক স্রোতের সাথে নাবিল বেরিয়ে গেল।
বেরোতেই দুই দিক থেকে দুটো নতুন স্রোত এসে মিশল। মুহূর্তের মধ্যে জ্বালাটা কমে গেল। কড়া টক সমুদ্র বদলে গেল শান্ত নদীতে।
যেন কেউ আগে থেকেই জানত, অ্যাসিড-সমুদ্রের পরেই একটা শান্ত জায়গা লাগবে। আর ঠিক সেখানেই সেটা বানিয়ে রেখেছে।
✦ ✦ ✦
নাবিল চারদিকে তাকাল। অনেকেই আর নেই। কিন্তু সবাই হারায়নি। এখানে-ওখানে আরও কিছু ভাই-বোন ভাসছে, ক্লান্ত, কিন্তু বেঁচে আছে।
"আমরা পেরেছি," কাঁপা গলায় বলল নাবিল।
সামনের পথটা এক আশ্চর্য জায়গা। দেয়াল জুড়ে লাখো লাখো নরম আঙুলের মতো ভাঁজ, যেন অন্তহীন এক মখমলের বন। এই পথটা আপনার অন্ত্র। মানুষের হিসাবে কয়েক মিটার লম্বা। নাবিলের হিসাবে পৃথিবীর এক মাথা থেকে আরেক মাথা।
স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলল আরও গভীরে, এমন এক জগতের দিকে যেখানে সূর্যের আলো কোনোদিন পৌঁছায় না, অথচ জীবন উপচে পড়ে।
অনেকক্ষণ পর, স্রোত যখন প্রায় থেমে এসেছে, নাবিল টের পেল তার চারপাশে কোটি কোটি প্রাণের উপস্থিতি। এটা একটা শহর। না, শহরও নয়। একটা গোটা সভ্যতা।
আর তখন অন্ধকারের ভেতর থেকে ভেসে এল একটা শান্ত, বয়স্ক কণ্ঠ:
"অ্যাসিড-সমুদ্র পার হয়ে এসেছ, দেখছি। সাহস আছে তোমার, ছোট্ট অতিথি।"
নাবিল চমকে ঘুরে তাকাল।
"ভয় পেয়ো না," কণ্ঠটা হাসল। "আমাকে সবাই দাদা বিফিদো বলে ডাকে। আমার বাপ-দাদা, তাদের বাপ-দাদা, সবাই এখানেই থেকেছে। তুমি ভাবছ, একটা মানুষের পেটে এসে পড়েছ। আসলে তুমি এসেছ এমন এক জায়গায়, যার কথা শুনলে তোমার বিশ্বাসই হবে না।"
"কী জায়গা?" নাবিল জিজ্ঞেস করল।
বুড়ো একটু থামল। তারপর বলল:
"একটা কোম্পানি। পৃথিবীর সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে নিখুঁত কোম্পানি। আর মজার ব্যাপার কী জানো? যে মানুষটার শরীরে এটা চলছে, সে নিজেই জানে না এটা কে চালায়।"
✦ ✦ ✦
আর আপনি?
এই লেখা পড়তে পড়তে আপনার পেটে এখনো হয়তো দুপুরের খাবার হজম হচ্ছে। অ্যাসিড ফুটছে, অথচ আপনার কিছু হচ্ছে না। দরজাগুলো খুলছে-বন্ধ হচ্ছে। দেয়াল নিঃশব্দে নতুন হচ্ছে।
আপনি কিছুই বলেননি। কিছুই করেননি। তবু সব ঠিকঠাক চলছে।
কে চালাচ্ছে?
(চলবে... দ্বিতীয় খণ্ড: স্বাগতম, এ এক কোম্পানি)