01/09/2026
মানুষের সঙ্গে মেলামেশার চারটি শ্রেণি
মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ও মেলামেশার ক্ষেত্রে মানুষকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা উচিত। এই চার শ্রেণির একটিকে আরেকটির সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে এবং তাদের মধ্যে পার্থক্য না করলে মানুষের জীবনে অনিষ্ট প্রবেশ করে।
অর্থাৎ, সব মানুষের সঙ্গে একই ধরনের সম্পর্ক রাখা ঠিক নয়। কারও সঙ্গে মেলামেশা প্রয়োজন, কারও সঙ্গে মেলামেশা উপকারী, আবার কারও থেকে দূরে থাকাই কল্যাণকর হতে পারে।
🔳 ১. যাদের সঙ্গে মেলামেশা খাবারের মতো
প্রথম শ্রেণির মানুষ হলো এমন, যাদের সঙ্গে মেলামেশা খাবারের মতো। অর্থাৎ, প্রতিদিনের জীবনে যেমন খাবার ছাড়া থাকা যায় না, তেমনি তাদের সাহচর্য থেকেও পুরোপুরি অমুখাপেক্ষী হওয়া যায় না।
তবে এখানেও পরিমিতি জরুরি। যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু তাদের সাহচর্য গ্রহণ করবে। প্রয়োজন পূরণ হলে অতিরিক্ত মেলামেশা করবে না। আবার যখন প্রয়োজন হবে, তখন তাদের কাছে ফিরে যাবে। এভাবেই নিয়মিত চলবে।
এ ধরনের মানুষ লাল সালফারের চেয়েও দুর্লভ।
অর্থাৎ, তাদের পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।
তারা হলেন এমন আলেম ও নেককার মানুষ, যারা:
আল্লাহ ও তাঁর বিধান সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন,
শয়তানের কৌশল ও ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জানেন,
অন্তরের রোগগুলো চেনেন,
এসব রোগের চিকিৎসা জানেন,
আল্লাহর প্রতি আন্তরিক,
আল্লাহর কিতাবের প্রতি আন্তরিক,
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি আন্তরিক,
এবং মানুষের কল্যাণ কামনা করেন।
এ ধরনের মানুষের সাহচর্যে লাভই লাভ। তাদের সঙ্গে মেলামেশা মানুষের ঈমান, জ্ঞান, আমল ও অন্তরকে উপকৃত করে।
🔳 ২. যাদের সঙ্গে মেলামেশা ওষুধের মতো
দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ হলো এমন, যাদের সাহচর্য ওষুধের মতো।
অসুস্থ হলে যেমন ওষুধের প্রয়োজন হয়, কিন্তু সুস্থ অবস্থায় সারাক্ষণ ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন হয় না, তেমনি এ ধরনের মানুষের সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী যোগাযোগ রাখতে হয়।
তারা এমন মানুষ, যাদের সঙ্গে মেলামেশা জীবনযাপনের বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণের জন্য অপরিহার্য।
যেমন:
ব্যবসায়িক বা পেশাগত লেনদেন,
বিভিন্ন ধরনের অংশীদারিত্ব,
পরামর্শ গ্রহণ,
কোনো সমস্যার সমাধান,
চিকিৎসা বা চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রয়োজন,
এবং এ ধরনের অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ।
অতএব, যতক্ষণ প্রয়োজন আছে, ততক্ষণ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে তাদের সাহচর্যে পড়ে থাকবে না।
🔳 ৩. যাদের সঙ্গে মেলামেশা রোগের মতো
তৃতীয় শ্রেণির মানুষ হলো এমন, যাদের সঙ্গে মেলামেশা বিভিন্ন মাত্রা ও ধরন অনুযায়ী রোগের মতো।
এই রোগ কারও ক্ষেত্রে সামান্য, আবার কারও ক্ষেত্রে অত্যন্ত মারাত্মক হতে পারে।
এর মধ্যে এমন কিছু মানুষ আছে, যাদের সাহচর্য দীর্ঘস্থায়ী ও মারাত্মক রোগের মতো। তাদের সঙ্গে মেলামেশা করে মানুষের দ্বীনে কোনো লাভ হয় না, দুনিয়াতেও কোনো লাভ হয় না। বরং তাদের সাহচর্যের মাধ্যমে দ্বীন অথবা দুনিয়া, কিংবা উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
যদি এমন ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় এবং দীর্ঘদিন সেই সম্পর্ক চলতে থাকে, তাহলে তা মৃত্যুঘাতী ও ভয়ংকর রোগের মতো হয়ে দাঁড়ায়।
আর এদের মধ্যেও এমন কিছু মানুষ আছে, যাদের সঙ্গে মেলামেশা দাঁতের ব্যথার মতো। তাদের সাহচর্যে থাকলে ব্যথা ও কষ্ট বাড়তে থাকে। কিন্তু যখন তাদের থেকে দূরে থাকা যায়, তখন সেই কষ্টও কমে যায়।
অর্থাৎ, কিছু মানুষের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখাই অন্তরের শান্তি, দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য বেশি নিরাপদ।
তৃতীয় শ্রেণির মানুষের মধ্যেই এমন কিছু মানুষ আছে, যাদের সঙ্গে মেলামেশা আত্মার জ্বরের মতো।
এরা এমন মানুষ, যারা স্বভাবগতভাবে ভারী, বিরক্তিকর এবং অসহনীয়। তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্বতাও এমন নয় যে, তারা কথা বলে আপনাকে কোনো উপকার করতে পারে। আবার তারা এমনভাবে শুনতেও জানে না যে, আপনার কাছ থেকে কোনো উপকার গ্রহণ করবে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তারা নিজেদের অবস্থান ও মূল্য বোঝে না।
তারা যখন কথা বলে, তাদের কথাগুলো শ্রোতার অন্তরে এমনভাবে আঘাত করে, যেন একের পর এক লাঠির আঘাত পড়ছে। অথচ নিজের কথার প্রতি তাদের এত বেশি মুগ্ধতা থাকে যে, তারা নিজেরাই নিজেদের কথা শুনে আনন্দিত হয়।
তারা যতবার কথা বলে, ততবার যেন নিজের মুখ থেকেই নিজের জন্য কিছু বের করে আনে। কিন্তু তাদের ধারণা, তারা এমন সুন্দর ও সুগন্ধি কথা বলছে, যা দিয়ে পুরো মজলিসকে আনন্দিত করে তুলছে।
আর তারা যদি চুপ করেও থাকে, তবুও তাদের উপস্থিতি অনেক সময় এমন ভারী লাগে, যেন একটি বিশাল যাঁতার পাথরের অর্ধেক অংশ, যেটা বহন করাও কঠিন, মাটির ওপর টেনে নিয়ে যাওয়াও কঠিন।
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন:
“আমার পাশে কোনো ভারী-স্বভাবের মানুষ বসলে আমি অনুভব করতাম, সে যে পাশে বসেছে, সেই পাশটি যেন অন্য পাশের তুলনায় নিচে নেমে গেছে।”
অর্থাৎ, তার উপস্থিতিই এতটা ভারী অনুভূত হতো।
প্রত্যেক বিরোধী স্বভাবের মানুষের সাহচর্যই আত্মার জন্য এক ধরনের জ্বর।
সারকথা হলো, যে ব্যক্তি আপনার স্বভাব, চিন্তা ও নৈতিকতার সঙ্গে এমনভাবে বিরোধী যে, তার সাহচর্য আপনার অন্তরকে কষ্ট দেয়, তার সঙ্গে মেলামেশা আত্মার জন্য এক ধরনের জ্বরের মতো।
কখনো এটি সাময়িক হয়, আবার কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যায়।
একজন বান্দার জন্য দুনিয়ার দুর্ভাগ্যগুলোর মধ্যে একটি হলো, তাকে যদি এই ধরনের কোনো মানুষের সঙ্গে নিয়মিত সম্পর্ক রাখতে বাধ্য হতে হয়।
কখনো পরিস্থিতির কারণে তার সঙ্গে মেলামেশা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। তখন করণীয় হলো:
তার সঙ্গে উত্তম আচরণ বজায় রাখা, ভদ্রতা ও সৌজন্য বজায় রেখে সম্পর্ক পরিচালনা করা।
হয়তো আল্লাহ তাআলা একসময় তার জন্য এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে মুক্তির কোনো পথ ও উপায় বের করে দেবেন।
অর্থাৎ, সব মানুষকে পছন্দ করা সম্ভব নয়, কিন্তু অপছন্দের মানুষটির সঙ্গেও ইসলামী আদব ও উত্তম চরিত্র বজায় রাখা সম্ভব।
🔳 ৪. যাদের সঙ্গে মেলামেশা পুরোপুরি ধ্বংসের কারণ এবং যাদের সাহচর্য বিষ খাওয়ার মতো
কেউ যদি বিষ খেয়ে ফেলে এবং তার কাছে যদি উপযুক্ত প্রতিষেধক থাকে, তাহলে সে বেঁচে যেতে পারে। কিন্তু যদি প্রতিষেধক না থাকে, তাহলে তার পরিণতির জন্য আর কিছু করার থাকে না।
মানুষের মধ্যে এই শ্রেণির লোকের সংখ্যা অত্যন্ত বেশি।
তারা হলো বিদআত ও ভ্রষ্টতার অনুসারী, যারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সুন্নাহ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং সুন্নাহর বিপরীত মত ও পথের দিকে আহ্বান করে।
তারা এমন লোক, যারা আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বাধা দেয় এবং সেই পথকে বাঁকা করে দেখাতে চায়।
ফলে তারা:
বিদআতকে সুন্নাহ বানিয়ে দেয়,
সুন্নাহকে বিদআত বলে প্রচার করে,
মারুফ বা শরিয়তসম্মত ভালো কাজকে মন্দ বলে দেখায়,
আর মুনকার বা শরিয়তবিরোধী কাজকে ভালো ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করে।
তাওহীদের কথা বললেও তাদের আপত্তি
আপনি যদি তাদের সামনে তাওহীদকে বিশুদ্ধ ও নির্ভেজালভাবে তুলে ধরেন, তখন তারা বলতে পারে:
“তুমি তো আল্লাহর ওলী ও নেককার বান্দাদের মর্যাদা কমিয়ে দিচ্ছ!”
অর্থাৎ, আল্লাহর ইবাদত ও উপাসনাকে একমাত্র তাঁর জন্য নির্দিষ্ট করার কথা বললেও তারা সেটিকে নেককারদের অসম্মান হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অনুসরণের কথা বললেও আপত্তি
আবার আপনি যদি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সুন্নাহর অনুসরণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন, তখন তারা বলতে পারে:
“তুমি তো অনুসরণীয় ইমামদের মতামতকে অগ্রাহ্য করে দিলে!”
অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)এর সরাসরি অনুসরণ ও সুন্নাহর দলিলকে সামনে রাখাকে তারা এমনভাবে উপস্থাপন করতে পারে, যেন এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী ইমাম ও আলেমদের অসম্মান করা হচ্ছে।
আর আপনি যদি আল্লাহ তাআলা নিজেকে যেভাবে বর্ণনা করেছেন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যেভাবে তাঁকে বর্ণনা করেছেন, ঠিক সেভাবেই আল্লাহর গুণাবলি বর্ণনা করেন, কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি বা অবহেলা ছাড়াই, তখন তারা বলে:
“তুমি তো আল্লাহকে সৃষ্টির সঙ্গে সাদৃশ্য দিচ্ছ!”
অর্থাৎ, আল্লাহর কুরআন ও সহিহ সুন্নাহয় বর্ণিত গুণাবলিকে যথাযথভাবে মেনে নিলেও তারা তাকে তাশবিহের অনুসারী বলে অভিযুক্ত করে।
আর আপনি যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ) যেসব ভালো কাজের নির্দেশ দিয়েছেন, সেগুলোর আদেশ করেন এবং যেসব মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করেছেন, সেগুলো থেকে নিষেধ করেন, তখন তারা বলে:
“তুমি তো মানুষকে ফিতনায় ফেলছ!”
আপনি যদি সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরেন এবং তার বিরোধী বিষয়গুলো পরিত্যাগ করেন, তখনও তারা বলে:
“তুমি তো পথভ্রষ্ট বিদআতিদের অন্তর্ভুক্ত!”
আর আপনি যদি আল্লাহর দিকে সম্পূর্ণভাবে ফিরে যান, তাঁর আনুগত্য ও ইবাদতে নিজেকে নিয়োজিত করেন এবং তাদেরকে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ভোগ-বিলাসে ডুবে থাকার অবস্থায় ছেড়ে দেন, তখন তারা বলে:
“তুমি তো মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছ!”
অর্থাৎ, আপনি যদি তাদের চিন্তা ও পথ অনুসরণ না করে আল্লাহর দিকে ফিরে যান, তাতেও তারা আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলবে।
কিন্তু আপনি যদি নিজের সঠিক অবস্থান ছেড়ে তাদের প্রবৃত্তি ও খেয়াল-খুশির অনুসরণ শুরু করেন, তাহলে আল্লাহর কাছে আপনি হয়ে যাবেন ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।
আর তাদের কাছে তখন আপনি হয়ে যাবেন: “মুনাফিক!”
অতএব, মানুষ কী বলছে, সেটিই সত্য-মিথ্যার মাপকাঠি নয়। বরং কুরআন, সহিহ সুন্নাহ এবং সত্যের দলিলকে মাপকাঠি বানানোই জরুরি।
তাই প্রকৃত বিচক্ষণতা হলো...
পূর্ণ বিচক্ষণতা ও নিরাপদ পথ হলো, এমন লোকদের অসন্তুষ্ট হলেও আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল (ﷺ) এর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা।
তাদের অসন্তুষ্টি বা বিরোধিতাকে ভয় করে সত্য থেকে সরে যাওয়া নয়। বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ যা পছন্দ করেন, সেটিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া।
তাদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্য ব্যস্ত হওয়ার দরকার নেই। বরং তাদের অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে নিজেকে ব্যস্ত না রেখে, তাদের কাছ থেকে ক্ষমা বা স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টাও না করাই উত্তম।
তারা আপনার নিন্দা করল কি না, আপনাকে অপছন্দ করল কি না, এ নিয়ে বিচলিত হওয়ারও প্রয়োজন নেই।
[তাফসিরে ইবনুল কাইয়্যিম:সূরা নাস, ৬ নং আয়াত]