09/09/2026
:: চিকিৎসা হোক সেবা, বাণিজ্য নয় ::
একজন প্রসূতি রোগী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হলেন। কয়েক ঘণ্টা চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের পর পরিবারকে জানানো হলো—“এখানে চিকিৎসা সম্ভব নয়, জেলা পর্যায়ের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করতে হবে।”
নিরুপায় স্বজনেরা তখন ছোটাছুটি শুরু করেন—কোথায় যাবেন? কীভাবে যাবেন? অনেক পরিবারের কাছে জেলা শহরে যাওয়ার গাড়িভাড়াটুকুও থাকে না। অসহায় অবস্থায় তারা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালের দরজায় ঘুরতে থাকেন।
এমন পরিস্থিতিতে আমাদের সমাজে এমনও বহু ঘটনা রয়েছে—হাসপাতালের কোনো নার্স কিংবা আয়া নিজের দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা থেকে রোগীকে সহযোগিতা করেছেন। কখনো নিজের বাসায় নিয়ে গিয়ে প্রসব করিয়েছেন, মা ও শিশুর জীবন রক্ষা করেছেন এবং পরে নিরাপদে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন।
এখানেই একটি প্রশ্ন সামনে আসে—
যে কাজটি একটি হাসপাতালের পক্ষে সম্ভব হলো না, সেই কাজটি একজন নার্স বা আয়া কীভাবে করে ফেললেন?
অবশ্যই, এর অর্থ এই নয় যে প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসা-সুবিধার বিকল্প হিসেবে অনভিজ্ঞ হাতে প্রসব করানোকে উৎসাহিত করা উচিত। বরং প্রশ্নটা আমাদের পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে। কেন একজন প্রসূতি মাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না দিয়ে এমন অবস্থায় রেফার করা হবে, যখন তার পরিবারের জেলা হাসপাতালে যাওয়ার সামর্থ্যই নেই?
আমরা প্রায়ই প্রান্তিক স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে নানা সমালোচনা শুনি। কিন্তু একই সঙ্গে কি আমরা বড় বড় বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনিয়ম, অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা চিকিৎসাসেবার বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন করি?
কখনো দেখা যায়, একজন রোগীকে কয়েক মিনিট সময় দেওয়ারও সুযোগ নেই; অথচ ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধির সঙ্গে দীর্ঘ সময় আলোচনা করার সময় পাওয়া যায়। রোগী চিকিৎসকের কক্ষ থেকে বের হওয়ার পর প্রতিনিধির হাতে থাকে মোবাইল—কোন ওষুধ লেখা হলো, তা জানার আগ্রহ!
প্রশ্ন হলো—ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধির প্রভাব বা প্রলোভনের কারণে যদি প্রেসক্রিপশন লিখতে হয়, তাহলে চিকিৎসকের পেশাগত স্বাধীনতা কোথায়?
চিকিৎসা কোনো সাধারণ ব্যবসা নয়। এটি মানুষের জীবন, আস্থা ও আশার সঙ্গে জড়িত একটি মহান দায়িত্ব।
আমরা এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা চাই—
যেখানে দরিদ্র মানুষ চিকিৎসার অভাবে অসহায় হবে না।
যেখানে একজন প্রসূতি মা শুধু অর্থের অভাবে ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন না।
যেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও রেফারেল ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে।
যেখানে রোগীকে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার বোঝা বহন করতে হবে না।
যেখানে চিকিৎসকের কাছে রোগীই হবে প্রথম অগ্রাধিকার।
এবং যেখানে হাসপাতাল, চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী—সবাই মানুষের সেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবেন।
আমরা এমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা চাই, যেখানে চিকিৎসা হবে সেবা—শুধু বাণিজ্য নয়।
কারণ একজন অসহায় মানুষের কাছে একজন চিকিৎসক কিংবা স্বাস্থ্যকর্মী শুধু একজন পেশাজীবী নন—
তিনি অনেক সময় বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়।