24/09/2026
আজ আমার বড় মেয়ের স্কুলে একটি প্রোগ্রাম ছিল। খুব ইচ্ছে ছিল ওর প্রোগ্রামটা দেখতে যাব। কিন্তু যেতে পারিনি। যখন ওর আবৃত্তি শুরু হবে, ঠিক সেই সময় আমার মা আমাকে জানালেন—আর আমি তখন একজন মায়ের ডেলিভারি করাচ্ছি।
একদিকে আমার নিজের সন্তান, অন্যদিকে আমার সামনে একজন মা ও তার অনাগত সন্তান। সেই মুহূর্তে আমার কাছে একটি শিশুর জীবন এবং একজন মায়ের নিরাপত্তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই নিজের মেয়ের বিশেষ মুহূর্তটাও দেখা হলো না।
প্রতিদিন এভাবে একের পর এক নরমাল ডেলিভারি করানো আসলে এত সহজ কোনো কাজ নয়। এর পেছনে থাকে অনেক সময়, ধৈর্য, অপেক্ষা, ত্যাগ আর নিজের ব্যক্তিগত জীবনের অসংখ্য মুহূর্ত বিসর্জন দেওয়া।
শুধু এটুকুই নয়—আমার নিজের মায়ের অপারেশনও ছিল। সেই সময়ও আমি মায়ের পাশে থাকতে পারিনি, তাকে সময় দিতে পারিনি। একজন সন্তান হিসেবে এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে? তবুও দায়িত্বের জায়গা থেকে আমাকে অন্য একজন মায়ের পাশে দাঁড়াতে হয়েছে।
বলতে গেলে, এর পেছনে রয়েছে অনেক না-বলা কষ্ট, অনেক ত্যাগ, অনেক রাতের নির্ঘুম অপেক্ষা। রোজার সময়ও কতদিন রোগীর পাশে থেকে ইফতার করতে পারিনি। সাদা পোশাকের আড়ালে যে কত রাতের ক্লান্তি, কত না-পারা, কত ত্যাগ লুকিয়ে থাকে—তা হয়তো বাইরে থেকে বোঝা যায় না।
শীতের রাতগুলোতে যখন সবাই ঘুমিয়ে থাকেন, তখন আমি একজন নরমাল ডেলিভারির রোগীকে নিয়ে সারারাত জেগে থাকি। কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করি, কখনো ভোর হয়ে যায়, তবুও একজন মা ও তার শিশুর নিরাপত্তার জন্য পাশে থাকি।
চাইলেই হয়তো সিজারিয়ান ডেলিভারি আমার সুবিধামতো সময়ে করিয়ে নিতে পারতাম। তাহলে নিজের সময়ও ঠিক রাখা যেত, পরিবারের জন্যও সময় বের করা সহজ হতো। কিন্তু শুধুমাত্র আমার সুবিধার জন্য আমি কখনো কোনো মাকে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের দিকে নিয়ে যাই না।
একটি নিরাপদ নরমাল ডেলিভারির জন্য যখন অপেক্ষা করা সম্ভব, তখন আমি অপেক্ষা করি। প্রয়োজন হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করি। এজন্যই হয়তো আমার কাছে এত নরমাল ডেলিভারি হয়।
গতকাল আমার ছোট মেয়ের জন্মদিন ছিল। যদিও আমি জন্মদিন সেভাবে পালন করি না, তারপরও ইচ্ছে ছিল অন্তত একবার মেয়েটাকে সময় দেব, একটু কাছে থাকব। কিন্তু চিকিৎসকের জীবন সব সময় নিজের ইচ্ছেমতো চলে না।
অনেক সময় আমার নিজের সন্তানদের সময় অন্য কারও সন্তান পৃথিবীতে আনার জন্য দিয়ে দিতে হয়। কখনো নিজের মায়ের পাশে থাকা হয় না, কখনো নিজের সন্তানদের বিশেষ মুহূর্ত মিস করতে হয়, কখনো নিজের শরীর-মনকে বিশ্রাম দেওয়ার সুযোগও থাকে না। তবুও একজন মা ও তার শিশুর নিরাপদ আগমনের মুহূর্তটি আমার কাছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
তাই আপনাদের কাছে আমার চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়—শুধু একটু ধৈর্য ধরবেন। নরমাল ডেলিভারি সময়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া। কখনো দ্রুত হয়, কখনো অনেক সময় লাগে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত মা ও শিশুর জন্য নিরাপদভাবে অপেক্ষা করা সম্ভব, ততক্ষণ আমি চেষ্টা করে যাই।
আর একটি বিষয় বিশেষভাবে অনুরোধ করছি—ভর্তির সময় দয়া করে সঙ্গে শুধু একজন মহিলা অভিভাবক নিয়ে আসবেন। পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আপনারা আমার রোগী হয়ে এখানে এলে দয়া করে অন্য কারও পরিচয় ব্যবহার করবেন না এবং কাউকে ফোন করে বিশেষ সুপারিশও করবেন না।
আমার কাছে সব রোগী সমান। কারও পরিচয়, ক্ষমতা বা সুপারিশ আমার চিকিৎসার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে না। রোগীই আমার কাছে প্রথম অগ্রাধিকার। যখন কেউ পরিচয় দেন বা ফোনে সুপারিশ করান, তখন আমি সত্যিই খুব বিব্রত বোধ করি। কারণ আমার কাছে প্রত্যেক মা সমান গুরুত্বপূর্ণ, প্রত্যেক শিশুর জীবন সমান মূল্যবান।
যারা এই বিষয়গুলো মানতে পারবেন না, দয়া করে আমার কাছে আসবেন না। আমি পরিচয় বা সুপারিশের ভিত্তিতে নয়, শুধুমাত্র রোগীর প্রয়োজন ও নিরাপত্তার ভিত্তিতে চিকিৎসা দিতে চাই।
আমি আমার দিক থেকে পরিষ্কার। কে কী ভাবলেন বা বললেন, তার চেয়ে আমার কাছে বড় কথা—উপরে আল্লাহ আছেন, তিনি সব দেখেন, সব জানেন।
আমি শুধু চেষ্টা করি আমার কাছে আসা প্রতিটি মা ও শিশুর জন্য আমার সর্বোচ্চটুকু দিতে। নিজের পরিবার, নিজের সন্তান, এমনকি নিজের মায়ের কাছ থেকেও দূরে থাকতে হলেও একজন রোগীর নিরাপত্তাকে আমি কখনো অবহেলা করতে পারি না।
আলহামদুলিল্লাহ।
অকারণে সিজার নয়—নিরাপদ নরমাল ডেলিভারি করানো আমাদের অঙ্গীকার।