26/06/2026
[ডা. বিরাজ শাহ কর্তৃক নেয়া প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাসের ৩ পর্বের ইন্টারভিউটির সম্প্রতি প্রকাশিত ২য় পর্ব। এমন মূল্যবান কথা, অভিজ্ঞতা ও ডিরেকশন আলোচনাটিতে উঠে এসেছে যে, হোমিওপ্যাথি সংশ্লিষ্ট প্রতিটি ব্যক্তি-সহ সাধারণ মানুষদেরও হোমিওপ্যাথির সত্যিকার রূপটাকে বুঝতে এটা পড়া উচিৎ]
ইন্টারভিউ: What it means to be a healer? [2nd Episode]
অনুবাদ: Dr. Shaheen Mahmud
ডা. বিরাজ শাহ: প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাস একজন প্রখ্যাত ক্লাসিক্যাল হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক, যিনি এই শতাব্দীতে ক্লাসিক্যাল হোমিওপ্যাথি ধারাকে নতুন করে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি হোমিওপ্যাথির একজন অধ্যাপক, একজন শিক্ষক, একজন চিন্তাবিদ ও একজন গবেষক; এক কথায় তাকে বলা যায় শিক্ষকদের শিক্ষক। আমরা আজ ইন্টারন্যাশনাল একাডেমি অব ক্লাসিক্যাল হোমিওপ্যাথিতে এসেছি তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নিতে এবং হোমিওপ্যাথি অঙ্গনে তাঁর পথচলা ও কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন করতে। তো চলুন, প্রফেসরের কাছ থেকে কিছু প্রশ্নের উত্তর জেনে নেওয়া যাক। আপনাকে ধন্যবাদ।
আপনি প্রায়শই আপনার লেখা ‘সায়েন্স অব হোমিওপ্যাথি’ (Science of Homeopathy) বইটির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়ে থাকেন, যা আপনি ১৯৭৮ সালে লিখেছিলেন। বইটির এখন পর্যন্ত ৩৭টি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। আমি আপনার কাছে এই বইটি এবং ‘লেভেলস অব হেলথ’ (Levels of Health) বা স্বাস্থ্যের স্তর বিন্যাস নিয়ে জানতে চাই—স্বাস্থ্যের স্তর নিয়ে অবশ্য পরে কথা বলব—তবে এই ‘সায়েন্স অব হোমিওপ্যাথি’ বইটি এখন পর্যন্ত বহু প্রজন্মের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকদের পথ দেখিয়েছে। সেই সময়ে কী আপনাকে এই বইটি লিখতে অনুপ্রাণিত করেছিল? আর আপনি কি তখন ভেবেছিলেন যে হোমিওপ্যাথিক সমাজের ওপর এর প্রভাব এতটা দূরপ্রসারী হবে?
প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাস: হ্যাঁ, আসলে হয়েছিল কী—১৯৭৬ সালে এথেন্সে ‘ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অব দ্য লিগা’ অনুষ্ঠিত হয়। সেই কংগ্রেসের পাশাপাশি সময়ে আমি প্রথমবারের মতো একটি ছোট দলকে আমন্ত্রণ জানাই, যেখানে আমি হোমিওপ্যাথির বিজ্ঞান এবং এটি নিয়ে আমার নিজস্ব তত্ত্ব ও চিন্তাভাবনাগুলো শেয়ার করি। মূলত সেই সুযোগেই আমি স্বাস্থ্যের বিভিন্ন স্তর এবং অন্যান্য থিওরিগুলো নিয়ে কথা বলা শুরু করেছিলাম।
ডা. বিরাজ শাহ: কিন্তু যেভাবে এই বইটি পরবর্তী প্রজন্মের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকদের গড়ে তুলেছে, সেই প্রভাবটাকে আপনি কীভাবে দেখেন? আপনি কি তখন এমন কিছু অনুমান করতে পেরেছিলেন?
প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাস: প্রভাবের কথা যদি বলেন, আমি ঠিক জানি না। এটা আসলে আমার ব্যক্তিত্বের একটা বৈশিষ্ট্য বা স্বভাব বলতে পারেন। আমার স্বভাবটা এমন যে, যখন যা করার দরকার তা করে ফেলি, কিন্তু পরে আর সেটা নিয়ে মেতে থাকি না, ভুলে যাই। আমি ওটার পেছনে লেগে থাকি না, কারণ আমার মনে হয় সামনে আরও নতুন চ্যালেঞ্জ আছে এবং নতুন চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হওয়ার জন্য আমাকে আমার পুরো শক্তি ও মনোযোগ সেখানে দিতে হবে। তাই বইটির প্রভাব কতটা ছিল তা নিয়ে আমি ওভাবে সচেতন ছিলাম না; যদিও এটি আমেরিকার একটি বড় প্রকাশনা সংস্থাসহ বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয়েছিল। আমার কখনো মনে হয়নি যে আমি খুব বড় কিছু করে ফেলেছি, কারণ একবার বইটা লেখা শেষ হয়ে যাওয়ার পর আমার কাছে সেই অধ্যায় ওখানেই শেষ।
ডা. বিরাজ শাহ: ঠিক আছে, ধন্যবাদ। সেই বইটিতে আপনি ‘সাসেক্টিবিলিটি’ (Susceptibility) বা রোগপ্রবণতা নিয়ে কথা বলেছেন। আপনি বলেছেন যে, যেখানে রোগপ্রবণতা থাকে সেখানেই রোগ নিজেকে প্রকাশ করে। আপনার কি মনে হয় রোগপ্রবণতা সম্পূর্ণ একটি জৈবিক (biological) বিষয়?
প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাস: হ্যাঁ, একেবারেই। এটি পুরোপুরি একটি জৈবিক বিষয় এবং এটি পুরো অর্গানিজম বা শরীরের ভেতরের এমন এক অবস্থা যা বংশগত বা জন্মগত প্রবণতা (hereditary predisposition) দ্বারা নির্ধারিত হয়। এরপর আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর যে ধকল বা চাপ যায়, তার ওপর ভিত্তি করে এটি শরীরে নতুন নতুন রোগপ্রবণতা তৈরি করে। শরীরে যত বেশি ধকল যাবে, আগে থেকে থাকা জন্মগত রোগপ্রবণতাগুলো তত বেশি জটিল ও মারাত্মক রোগ হিসেবে প্রকাশ পাবে।
ডা. বিরাজ শাহ: আপনি আপনার বইতে এবং আপনার শিক্ষাদানে কেস টেকিং (Case taking) বা রোগী লিপিকরণের গুরুত্ব নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। আপনি বলেছেন যে, হোমিওপ্যাথদের কোনো শর্টকাট বা সংক্ষিপ্ত উপায়ের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়, বরং পুরো কেসটি বিস্তারিতভাবে নেওয়া উচিত—যা আপনি নিজেও আপনার অসংখ্য রোগীর ক্ষেত্রে করে এসেছেন। ‘সায়েন্স অব হোমিওপ্যাথি’ বইতেও আপনি জোর দিয়ে বলেছেন যে কেস টেকিং একটি শিল্প এবং একটি প্রক্রিয়া। তো একজন রোগীকে সঠিকভাবে বোঝার জন্য বা ভালো কেস টেকার হওয়ার জন্য বইয়ের জ্ঞানের পাশাপাশি একজন হোমিওপ্যাথের আর কী কী গুণ থাকা দরকার?
প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাস: হ্যাঁ, আমি বুঝতে পেরেছি। আচ্ছা, সবচেয়ে প্রধান বিষয় হলো—একজন হোমিওপ্যাথকে, বিশেষ করে, একদম ‘খালি মন’ নিয়ে (পূর্বধারণা ছাড়া) রোগীর কথা শোনা শিখতে হবে। হোমিওপ্যাথির জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো কোনো পূর্বধারণা বা সংস্কার নিয়ে বসে থাকা। যেমন—আপনি রোগীকে একটা নড়াচড়া করতে দেখলেন বা একটা নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে বসতে দেখলেন, আর সাথে সাথে আপনার মাথায় কিছু ওষুধের নাম চলে এলো—এভাবে ভাবাটা একটি ভালো কেস টেকিংয়ের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। একটি ভালো কেস টেকিংয়ের মানে হলো, চিকিৎসক নিজেকে পুরোপুরি শান্ত করবেন এবং রোগী কী বোঝাতে বা প্রকাশ করতে চাচ্ছেন - তা কোনো রকম পক্ষপাত ছাড়া মনোযোগ দিয়ে শুনবেন এবং উপলব্ধি করবেন। আমি মনে করি, এই গুণটি অর্জন করা বেশ কঠিন।
আমি এর ওপর যতটা সম্ভব জোর দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমার মনে আছে, আমি যখন আমেরিকায় ছিলাম, তখন নিউরো-লিঙ্গুইস্টিকস নিয়ে কাজ করা একটি দল একটি কেস স্টাডি করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা দেখতে চেয়েছিল রোগী দেখার সময় চিকিৎসকের ব্রেনের অবস্থা কেমন থাকে। তারা ব্রেন রিডিংয়ের সব যন্ত্রপাতি ফিট করল এবং আমি একটি কেস নিলাম। পরে আশেপাশে থাকা শিক্ষার্থীরা যখন জানতে চাইল যে আমার ব্রেনে কী ঘটছিল বা ব্রেন কীভাবে কাজ করছিল, তখন তারা (গবেষকরা) হেসে বলল, "উনার তো কোনো ব্রেনই নেই!" তারা কেন এমন বলল? কারণ রোগী দেখার সময় আমার মন এতটাই শান্ত ও নীরব ছিল যে ব্রেনে কোনো অতিরিক্ত আলোড়ন বা চিন্তা তৈরিই হয়নি। এই ঘটনাটি আমার আগের বিশ্বাসকেই প্রমাণ করেছিল—রোগীর কষ্ট বা সমস্যার কথা কোনো রকম পূর্বধারণা বা পক্ষপাত ছাড়া শুনতে হবে।
ডা. বিরাজ শাহ: আচ্ছা, আপনি বললেন যে কনফারেন্সে আপনি বইটির পাশাপাশি ‘লেভেলস অব হেলথ’ বা স্বাস্থ্যের স্তরের ধারণাটি দিয়েছিলেন। কিন্তু স্বাস্থ্যের স্তরের এই মডেলটি তৈরি করার পেছনে আপনার কোন ক্লিনিক্যাল জটিলতা বা হতাশা কাজ করেছিল?
প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাস: ওষুধ দেওয়ার পর রোগীরা যেভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছিল, তা আমার মনে একটা কৌতূহল তৈরি করে। আমি দেখতাম একেকজন রোগী একেক রকম প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। কেস নেওয়ার সময় আমার উদ্দেশ্যই থাকত রোগীকে শান্ত করা, যাতে সে তার ভেতরের অনুভূতিগুলো স্পষ্ট করে বলতে পারে। কিন্তু রোগী যা প্রকাশ করত, তা সবসময় কোনো একটি নির্দিষ্ট ওষুধের স্পষ্ট চিত্র ফুটিয়ে তুলত না। দেখা যেত আমি একটি ওষুধের চিত্র পাচ্ছি, কিন্তু পাশাপাশি এমন কিছু লক্ষণও রয়ে যাচ্ছে যা হয়তো পরবর্তীতে চিকিৎসা করতে হবে।
এই পর্যবেক্ষণ থেকেই আমার মনে হলো স্বাস্থ্যের একটা ধারাবাহিক স্তর বা ধাপ রয়েছে। স্বাস্থ্যকে আমি স্থির কিছু হিসেবে দেখতে পাইনি। আমার কাছে মনে হতো রোগীর অবস্থা যেন একটা রশির ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার মতো, যেখানে প্রতি মুহূর্তে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয় এবং যেকোনো সময় পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। আমি এমন রোগীও দেখেছি যাদের চিকিৎসা করা হয়েছে এবং তারা যখন ফলো-আপে এসেছে, তাদের সঠিক ওষুধই দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তার মধ্যেই আমি এমন কিছু নির্দেশক লক্ষণ দেখতে পেতাম যা তার আগের স্বাস্থ্য অবস্থাকে ধরে রেখেছিল। এই সমস্ত পর্যবেক্ষণ এবং অভিজ্ঞতা থেকেই আমার মাথায় স্বাস্থ্যের স্তর বিন্যাসের (Levels of Health) ধারণাটি আসে।
ডা. বিরাজ শাহ: আপনি আপনার ‘লেভেলস অব হেলথ’ বইতে জ্বর এবং বিশেষ করে ইনফ্লামেশন বা প্রদাহের প্রক্রিয়া নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। আমরা তো বলতেই পারি যে জ্বর আসলে আমাদের জন্য এক ধরণের আশীর্বাদ। কিন্তু যেসব রোগী বা ডাক্তার জ্বরকে ভয় পান, আমরা তাদের কীভাবে সচেতন করতে পারি?
প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাস: জ্বর এমন এক আশীর্বাদ যা মানুষকে মেরেও ফেলতে পারে—এটাও পরিষ্কার থাকা ভালো! হ্যাঁ।
ডা. বিরাজ শাহ: কিন্তু যারা জ্বরকে ভয় পান, সেই রোগী আর ডাক্তারদের আমরা কীভাবে বোঝাব?
প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাস: যাদের চিকিৎসার সাথে কোনো যোগাযোগ নেই, সাধারণ মানুষের কাছে জ্বর আসলেই একটা ভীতিকর বিষয়। তবে একজন ভালো শিশু বিশেষজ্ঞ বা একজন ভালো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বুঝবেন কোন জ্বরটা মারাত্মক এবং সেটির বিশেষ যত্ন দরকার, আর কোন জ্বরটা শরীরের ভেতরটা পরিষ্কার করে রোগমুক্ত হতে সাহায্য করছে। আমি জ্বরের এই গুরুত্বটা বুঝতে পেরেছিলাম। বাবা-মায়েরা যে জ্বর আসার সাথে সাথেই তা ওষুধ দিয়ে থামিয়ে দেন এবং জ্বরটাকে তার নিজের গতিতে বাড়তে দেন না, এটি যে কতটা ভুল তা আমি উপলব্ধি করেছি। এই সব কিছুই আসলে অসংখ্য রোগী দেখা, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং মনের ভেতর আসা নানা চিন্তাভাবনাকে গুছিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে তৈরি হয়েছে।
আমার মনে হয়েছিল হোমিওপ্যাথি একটি সম্পূর্ণ চিকিৎসা ব্যবস্থা, যা প্রচলিত চিকিৎসার চেয়ে আলাদা এবং এই নিরাময় পদ্ধতির নিজস্ব কিছু নিয়ম আমাদের খুঁজে বের করতে হবে, যাতে নতুন প্রজন্মের কাছে তা একদম নিখুঁতভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়। অবশ্যই আমাদের এখনো অনেক প্রশ্ন আছে, অনেক অসুবিধা আছে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। অন্তত আমি চেষ্টা করছি, যদিও আমি শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছি, তাও আরও বই পড়ার এবং আরও নতুন কিছু জানার কৌতূহল আমার এখনো আছে।
ডা. বিরাজ শাহ: আপনি ‘সায়েন্স অব হোমিওপ্যাথি’ বইতে পোটেনটাইজেশন (Potentization) বা ওষুধের শক্তিকরণ এবং ওষুধ প্রস্তুত প্রণালী নিয়ে লিখেছেন। আজ কোয়ান্টাম ফিজিক্স এবং বায়োফিল্ড গবেষণার সাহায্যে আপনি একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন, যেখানে হোমিওপ্যাথিক উচ্চ শক্তিকৃত তরলে ওষুধের সূক্ষ্ম অস্তিত্বের প্রমাণ দেখানো হয়েছে। এই গবেষণাটি সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাস: হ্যাঁ। আমার কাছে সবচেয়ে চমৎকার লেগেছিল যে, আমরা যেসব প্রযুক্তি বা ডিভাইস ব্যবহার করেছিলাম, সেগুলোর মাধ্যমে কম্পিউটারের পর্দায় ওষুধের সেই 'ছাপ' বা চিহ্নটি খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়েছিল। এটা ছিল একটা দারুণ আবিষ্কার! কারণ হোমিওপ্যাথির বিরোধিতাকারীরা সবসময় এই বলেই আক্রমণ করত যে, ওষুধটিকে এতটাই পাতলা বা ডাইলুট করা হয় যে সেখানে মূল উপাদানের আর কিছুই থাকে না। কিন্তু সাব-অ্যাটমিক বা উপ-পরমাণু স্তরে গিয়ে যখন আমরা অতি ক্ষুদ্র কণাগুলোর কথা চিন্তা করি, তখনই কেবল হোমিওপ্যাথিক ওষুধের কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়—আর আমরা স্ক্রিনে সেই অস্তিত্বের ছাপ দেখাতে পেরেছি। হোমিওপ্যাথিক ওষুধ হলো একটি অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী জিনিস।
ডা. বিরাজ শাহ: কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের কাছে এটা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে যে, কোনো জিনিসে মূল উপাদানের বস্তুগত অস্তিত্ব না থাকার পরও তা কীভাবে কাজ করে। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, "যেখানে কিছুই নেই, সেটা কীভাবে কাজ করবে?"—তবে আপনি তাকে কী বলবেন?
প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাস: হ্যাঁ, আমি এই কথাটা জানি এবং যখনই তারা এই যুক্তি দেয়, আমি বেশ বিরক্ত হই। আমি তাদের বলি—"আসুন, আমি আপনার চিকিৎসা করি। তারপর আপনি কেমন বোধ করছেন তা নিজেই দেখে নিন এবং বুঝুন যে এই শক্তিকৃত ওষুধ কী করতে পারে।" কিন্তু এখন যেহেতু আমাদের কাছে প্রমাণ আছে, আমরা স্ক্রিনে এটা দেখাতে পারছি এবং এটি একটি বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে—তাই 'কিছুই নেই' এমন বলার কোনো সুযোগ নেই। এটা এমন এক অস্তিত্ব যা যুগ যুগ ধরে ছিল। প্রাচীনকালের সংবেদনশীল বা সূক্ষ্ম অনুভূতিসম্পন্ন মানুষরাও এটি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।
ডা. বিরাজ শাহ: আপনি পেপারটি নিয়ে বললেন এবং খুব সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিলেন যে এই শক্তি একদম শুরু থেকেই ছিল। কিন্তু আপনার কী মনে হয়, মূলধারার বিজ্ঞান বা সমাজ এটিকে গ্রহণ করতে এত সময় নিচ্ছে কেন?
প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাস: সময় নিচ্ছে কারণ নতুন যেকোনো ধারণার ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটে; নতুন চিন্তাভাবনাকে মানুষ খুব ধীরে গ্রহণ করে। প্রথমে মানুষ উদাসীন থাকে, তারপর তারা এটাকে প্রত্যাখ্যান করে, এরপর এটা নিয়ে লড়াই বা বিরোধিতা করে এবং সবশেষে তারা মেনে নেয়। প্রতিটি নতুন আইডিয়াকেই এই চক্রের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। হোমিওপ্যাথির ক্ষেত্রেও দীর্ঘ সময় লাগছে, তবে একই সাথে এটাও সত্য যে, আমি যখন ১৯৬০ সালে প্র্যাকটিস শুরু করেছিলাম, তখনকার চেয়ে এখন বিশ্বজুড়ে অনেক বেশি মানুষ হোমিওপ্যাথি ব্যবহার করছেন। ১৯৬০ সালের দিকে সারা বিশ্বে হাতেগোনা কিছু মানুষ নিম্ন শক্তি (low potency) ব্যবহার করতেন, আর আজ সারা বিশ্বে উচ্চ শক্তির ওষুধ ব্যবহার হচ্ছে এবং এর অভাবনীয় নিরাময়ের প্রমাণ মূলধারার মেডিকেল জার্নালগুলোতেও প্রকাশিত হচ্ছে।
ডা. বিরাজ শাহ: আপনি কি বিশ্বাস করেন যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিজ্ঞানীরা এই পেপারটিকে ভিত্তি ধরে এই ক্ষেত্রে আরও গবেষণার দিকে এগিয়ে যাবেন? আপনি তাদের কীভাবে উৎসাহিত করবেন?
প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাস: আমি বিশ্বাস করি তারা এটা করবে। তবে ঠিক কীভাবে করবে বা কোন বিজ্ঞান এই দায়িত্ব নেবে তা আমি বলতে পারছি না। তবে নিশ্চিতভাবেই মানুষের শরীরের এনার্জি লেভেল বা শক্তি স্তরের ওপর ভিত্তি করেই আগামীদিনের এই অনুসন্ধানগুলো এগিয়ে যাবে।
ডা. বিরাজ শাহ: ঠিক আছে, এবার আমরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যাব, যা হলো—‘কন্টিনিউয়াম অব ইউনিফাইড থিওরি অব ডিজিজেস’ (Continuum of Unified Theory of Diseases)। কোন মূল ক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণ আপনাকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সাহায্য করেছিল যে, রোগের মধ্যে এক ধরণের ধারাবাহিকতা বা যোগসূত্র রয়েছে?
প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাস: আসলে অনেক সময় রোগীরা নিজেরাই এই কথা উল্লেখ করত যখন আমি তাদের জিজ্ঞেস করতাম। দেখা যেত তাদের অনেক লক্ষণ বা কষ্ট শুরু হয়েছিল কোনো একটি দুর্ঘটনার পর, অথবা কোনো বিষাক্ত কিছু খাওয়ার পর, কিংবা তীব্র জ্বর আসার পর যখন সেটাকে সাপ্রেস বা জোর করে থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আবার অনেকের ক্ষেত্রে সিফিলিস বা গনোরিয়ার মতো ইনফেকশনের পর থেকেই স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছিল এবং সেই ইনফেকশনের দিন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত তার প্রভাব শরীরে রয়ে গেছে। তবে সময়ের সাথে সাথে লক্ষণগুলো রূপ বদলায়; শুরুতে যে লক্ষণ ছিল, কয়েক বছর পর তা অন্য কোনো জটিল লক্ষণে রূপ নেয়।
এই সমস্ত বিষয়ই আমাকে এই সিদ্ধান্তে এনেছে যে, মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত ঘটনার দ্বারাই ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদী রোগগুলো জেগে ওঠে বা ট্রিগার হয়। এবং এই রোগের প্রভাব বছরের পর বছর শরীরে থেকে যায়, যতক্ষণ না তারা এমন একজন হোমিওপ্যাথের কাছে আসে যিনি রোগীর অতীতের ইতিহাস জানতে আগ্রহী এবং কেন এখন এই প্যাথলজি বা রোগ তৈরি হলো তা নিয়ে ভাবেন। আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থায় এই দিকটিকে ওভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। প্রচলিত চিকিৎসায় তারা বর্তমানে যা দেখছে, সেই রোগ বা প্যাথলজির শেষ ফলাফলটুকুর ওপর আক্রমণ করে। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে রোগ একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, যা শুরু হয় কোনো মানসিক বা শারীরিক ট্রমা (আঘাত) থেকে, অথবা শরীরের ওপর অতিরিক্ত কেমিক্যাল ড্রাগের অপব্যবহার থেকে—যা আজকালকার তরুণরা একটু ‘হাই’ হওয়ার জন্য বা আনন্দের জন্য ব্যবহার করছে। এটা আসলে একটা টাইম বোমার মতো যা বিস্ফোরণের অপেক্ষায় আছে; কারণ এর ফলে মানুষের স্বাস্থ্য নষ্ট হবে, মানুষ মানসিক ভারসাম্য হারাবে এবং সমাজে একটা ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে।
ডা. বিরাজ শাহ: এই থিওরি অনুযায়ী, শৈশবে যদি কোনো তীব্র বা একিউট (acute) রোগকে সাপ্রেস বা চাপা দেওয়া হয়, তবে পরবর্তী জীবনে ক্রনিক বা বিধ্বংসী (degenerative) রোগ তৈরি হতে পারে। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে কোন প্যাটার্ন বা উদাহরণের মাধ্যমে এটি সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়? একজন হোমিওপ্যাথ কীভাবে বুঝবেন যে এই পয়েন্টেই রোগটি চাপা পড়েছিল এবং এটাই ক্রনিক রোগের কারণ?
প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাস: আমার মনে হয় না সাধারণ রোগী এটা পুরোপুরি বুঝতে পারে। রোগী বিভিন্ন কারণে কষ্ট পায় এবং সেই কষ্ট তার ডিফেন্স মেকানিজম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর একটা দাগ বা ক্ষত রেখে যায়। পরবর্তীতে যখন দ্বিতীয় বা তৃতীয় কোনো ট্রমা আসে, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। এভাবেই পিতামাতার কাছ থেকে পাওয়া জন্মগত রোগপ্রবণতা এবং পরবর্তীতে নিজের জীবনের এপিজেনেটিক্স বা পারিপার্শ্বিক অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণে একটি জটিল প্যাথলজি তৈরি হয়।
ডা. বিরাজ শাহ: আমি জানতে চাচ্ছিলাম, এই থিওরি ওষুধ নির্বাচন, কেস ম্যানেজমেন্ট বা রোগের পূর্বাভাস (prognosis) দেওয়ার ক্ষেত্রে কীভাবে সাহায্য করে?
প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাস: এই থিওরি খুব সহজভাবে ব্যাখ্যা করে যে, কেন একজন রোগীর সুস্থ হতে ৫ বছর সময় লাগে আর অন্য একজন রোগী মাত্র ১ মাসেই ভালো হয়ে যায়। যার শরীরে একাধিক ট্রমা বা আঘাতের ইতিহাস আছে, তার শরীরের গভীরের স্তরগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেই অর্গানিজমকে আবার সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবেই। বর্তমানের রোগটি যে অতীতের সমস্ত ঘটনারই একটা ফলাফল—তা বোঝার জন্যই এই থিওরির উপযোগিতা।
ডা. বিরাজ শাহ: আপনি যখন এই তত্ত্বটি সামনে এনেছিলেন, তখন নিশ্চয়ই অনেক ভালো মন্তব্যের পাশাপাশি কিছু সমালোচনাও পেয়েছিলেন। এত বছর পর এখন সেই সমালোচনাগুলোকে আপনি কীভাবে দেখেন?
প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাস: আমি বিষয়টিকে খুব ইতিবাচকভাবেই নিই, কারণ আমি আসলে সমালোচনাগুলোতে খুব একটা কান দিই না! যদি কোনো মানুষ সিরিয়াস বা আন্তরিক হন, তবে তিনি আমাদের কথাগুলো গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা করবেন। আর এমন একজন সিরিয়াস মানুষ যিনি সততার সাথে অনুসন্ধান করেন, তিনি সবসময়ই স্বাগত; কারণ গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমেই নতুন উন্নতি ও ভালো কিছু করা সম্ভব হয়।
ডা. বিরাজ শাহ: আপনি এই থিওরিতে শৈশব থেকে শুরু করে চিকিৎসকের কাছে আসা পর্যন্ত সময়ের একটি যোগসূত্র দেখিয়েছেন। কিন্তু আপনি সুস্থ সন্তান জন্মদানের বিষয়েও একটি ধারণা দিয়েছেন, যাকে আপনি কখনো কখনো "চিলড্রেন অব লাভ" বা ভালোবাসার সন্তান বলেন। প্যারেন্টিং বা সন্তান লালন-পালন এবং এই সুন্দর চিন্তাটি আপনার মাথায় কীভাবে এলো, তা নিয়ে যদি সংক্ষেপে কিছু বলতেন?
প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাস: দেখুন, এই চিন্তাটা আমার মাথায় আসার কারণ হলো আমি সাধারণত পুরো পরিবারের চিকিৎসা করতাম। প্রথমে পরিবারের একজন আসত, উপকার পেয়ে পরে পুরো পরিবারকে নিয়ে আসত। এর ফলে আমি একই বাবা-মায়ের বিভিন্ন সন্তানের স্বাস্থ্যের অবস্থা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমি জানতে চাইতাম কেন একই পরিবারের একটি সন্তান এত শান্ত, সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ, আর অন্যটি একদম দুষ্টু বা অসুস্থ প্রকৃতির। আমি যখনই এটি নিয়ে অনুসন্ধান করতাম, তখন বাবা-মায়েরাই আমাকে জানাতেন যে—যে সন্তানটি বেশি সুস্থ ও শান্ত, তার গর্ভধারণের সময়কার পারিবারিক পরিস্থিতি ও মানসিক অবস্থা অন্য অসুস্থ সন্তানটির সময়ের চেয়ে অনেক ভালো এবং শান্তিপূর্ণ ছিল।
বাবা-মায়ের পারস্পরিক ভালোবাসা যে সন্তানের ওপর কতটা গভীর প্রভাব ফেলে, তা আমি এই কঠিন পৃথিবীতে শিশুদের আসার ধরণ দেখে উপলব্ধি করেছি। আমার কাছে মানুষের অবয়ব বা স্বভাবের মধ্যে একটা ছন্দ বা হার্মনি থাকে, আর যখনই আমি এই সুন্দর ভারসাম্য দেখতে পাই, আমি তাদের জিজ্ঞেস করি, "আপনাদের কি মনে আছে তখন আপনাদের মানসিক অবস্থা কেমন ছিল?" তারা বলতেন যে তারা তখন একে অপরের গভীর ভালোবাসার মধ্যে ছিলেন। অন্যদিকে, যেসব শিশু নানা সমস্যা নিয়ে জন্মায়, তাদের পেছনের ইতিহাস ঘেঁটে আমি দেখেছি যে সেই সময়ে বাবা-মায়ের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ বা অশান্তি চলছিল।
ডা. বিরাজ শাহ: আপনি আপনার জীবনে শত শত, হাজার হাজার কেস দেখেছেন। এখনো কি আপনি মানুষকে দেখে বা এই নিরাময় প্রক্রিয়া দেখে বিস্মিত হন?
প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাস: দেখুন, মাঝে মাঝে—আসলে মাঝে মাঝে না, বহুবার আমি বলব—ওষুধের কার্যকারিতা এতটাই চমৎকার হয় যে এটিকে অলৌকিক বা মিরাকল মনে হয়। আর মিরাকল সবসময়ই আপনাকে একটা দারুণ আনন্দ ও স্বস্তি দেয়। বিস্মিত হওয়া বলতে আমি এই আনন্দঘন অনুভূতিটাকেই বুঝি, যখন দেখি একজন অসুস্থ মানুষ সুস্থ হয়ে আবার জীবনে ভারসাম্য ফিরে পেয়েছে। তখন তারা চিকিৎসকের প্রতি যে ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, তা আসলে একটি ভালোবাসার সমাজ তৈরি করে—ঘৃণার সমাজ নয়।
ডা. বিরাজ শাহ: এই সাক্ষাৎকারটি দেখার জন্য আপনাদের সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ এবং আমাদের এত সুন্দর একটি সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য আমরা প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাসের প্রতি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। ক্লাসিক্যাল হোমিওপ্যাথির ক্ষেত্রে তিনি এক অনন্য অনুপ্রেরণার নাম। আমরা তাঁর কাজের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। আশাকরি নতুন প্রজন্ম তাঁর আদর্শ ও শিক্ষা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ক্লাসিক্যাল হোমিওপ্যাথির ច ক্ষেত্রে একেকজন সফল চিকিৎসক হিসেবে গড়ে উঠবেন। আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং ভিডিওটি উপভোগ করার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। আশা করি খুব শীঘ্রই প্রফেসর জর্জ ভিথোলকাসের সাথে নতুন কোনো সাক্ষাৎকারে আমাদের আবার দেখা হবে। ধন্যবাদ।