11/03/2026
|| শীতলাষ্টমী - ব্রতকথা ||
গ্রামবাংলার একটা প্রসিদ্ধ জায়গার নাম যদি করা হয় তাহলে শীতলার থান থাকবেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। এখন এই শীতলা মা কে লোকজন বেশ ভয় করেই চলে। সর্বদাই ভয় হয় যে কোনো ত্রুটি হলে, মা সব ধ্বংস করে দেবেন।
এই ভয় কিন্তু অমূলক নয়, হ্যাঁ, শীতলা মা রাগী। কিন্তু মানুষজন যেভাবে প্রচার করে ততটাও নয়।
আজ শীতলাষ্টমী। বলা যেতে পারে মা শীতলা পুজোর একটা অফিশিয়াল তিথি। আদ্যাশক্তির এক অংশ হলেন মা -রোগব্যাধি মুক্তির দেবী। দোল পরবর্তী অষ্টমী (কৃষ্ণাষ্টমী) যা মূলত চৈত্রে পড়ে থাকে সেটাই শীতলাষ্টমী। এবার তিথি পড়েছে ফাল্গুনে। তবে শীতলা পুজো এখন এই চৈত্র-বৈশাখ পর্যন্ত জোরকদমে বিভিন্ন জায়গায় মহাসমারোহে চলবে।
আপনি যদি গ্রামে যান, তাহলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মায়ের কালো শিলা রূপের পুজো দেখবেন। মূর্তি সেরকম পাওয়া কঠিন। তবে হাওড়ার সালকিয়ায় আপনি বেশ কিছু মূর্তি পাবেন। এমনিতেও হাওড়ায় বেশ বড় বড় মূর্তির পুজো হয়। তার একটি সামগ্রিক রূপ নিচের ছবিতে দেখানো হয়েছে।
তবে এ প্রসঙ্গে বলি, মা কিন্তু দিগম্বরী। (প্রণাম মন্ত্র অনুযায়ী) অধম ভক্তের কল্পনায় মাকে আভূষণ দিয়েছি, নিজ গুণে ক্ষমা করে দেবেন।
যদি মূর্তি দেখি, দেখতে পাবো মায়ের এক হাতে ঝাঁটা, অপর হাতে কলস। মাথায় রয়েছে কুলো আর গাধার পিঠে বসে আছেন। শুনলে অবাক লাগবে এই প্রতিটি বিষয়ের তাৎপর্য আছে।
ঝাঁটা-কুলো - একটু ভেবে দেখবেন এগুলো কোন কাজে ব্যবহৃত হয়, কুলো প্রধানত শস্য ঝাড়াই বাছাই, আর ঝাঁটাও ঘরের জঞ্জাল সাফ করায়। মা স্বয়ং এইগুলি ধারণ করে সন্তানের বসন্তকালীন রোগব্যাধি হরণ ও নিরাময় করছেন। আর কলসে রয়েছে শান্তিবারি, ভক্তের উদ্দেশ্যে শান্তিবারি প্রদান করে তাকে শীতল করছেন, রোগমুক্ত করছেন। মা কল্যাণময়ী, সন্তানের রোগভোগ সহ্য করতে পারেন কি?
সাথে রয়েছে বাহন গাধা। অন্যান্য দেবদেবীরা সব বাহন নিয়ে নিয়েছেন। পরে আছে গাধা। মা তাকেই গ্রহণ করলেন । আসলে একটু ভাবলেই বোঝা যায় এর তাৎপর্য। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে গাধার দুধ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এখানেও মায়ের কাজের সাথে মিলে গেল! ভারতবর্ষের পুরাণ অতি চমৎকার। এখানে প্রতিটি অংশের যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা আছে যা এখনো আমাকে অবাক করে!
বসন্তকাল মনোরম ঋতু হলেও, মানুষের রোগভোগের শেষ থাকেনা। বসন্ত, হাম, চর্মরোগে একসময় পর্যন্ত মা শীতলার থানে বহু মানুষ প্রার্থনা করেছেন। কিন্তু এক্ষেত্রে বলে রাখি, এইরকম পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ প্রথম কর্তব্য, সাথে থাকবে আপনার অন্তর থেকে প্রার্থনা। সব মিলেই রোগী সুস্থ হবেন।
এখন মা শীতলার এত কথা শুনছি, ব্রতকথা না পড়লে মনটা ভরে না। আসুন আজকের দিনে ব্রতকথা পড়ি, পূর্ণ ভক্তি সহকারে।
যেভাবে শুরু হয়, বহু কাল আগে এক ব্রাহ্মণী সুখে সংসার করছিল তার দুই পুত্রবধূ, নাতিদের সাথে। ব্রাহ্মণী ছিলেন ধর্মপ্রাণা। বিভিন্ন ব্রত পালনের সাথে সাথেই দোল পরবর্তী কৃষ্ণাষ্টমীতে মা শীতলার ব্রতপালন করবেন। এখন এই ব্রতপালনে আগের দিন অর্থাৎ সপ্তমীতে রান্না করে রেখে অষ্টমীতে বাসি খাওয়া হয়। ঠাকুরকেও শীতল ভোগ ই দেওয়া হয়।
কিন্তু পুত্রবধূ ও নাতিরা বাসি ভোগ খাওয়ায় অনীহা প্রকাশ করলো। তাই তারা লুকিয়ে গরম রান্না খেয়ে পুনরায় ব্রত চলাকালীন সামান্য বাসি খাবার খেলো।
এ দৃশ্য দেখে মা শীতলা গেলেন রেগে। ঐ বৌদের আদরের সন্তানদের করলেন রোগগ্রস্ত। সন্তানদের কষ্টে ব্যথিত মায়েরা তাদের নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করাতে নিয়ে গেল, কিন্তু কোথাও কোনো সুরাহা হলো না।
এরকম করেই ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ দুই বৌ দেখতে পেল এক গাছের তলায় দুই বোন বসে মাথা চুলকাচ্ছে। কাছে গিয়ে তারা জানতে পারে ঐ দুই বোনের নাম ওরী ও শীতলা এবং তাদের মাথায় প্রচুর উকুন।
বৌয়েরা তাদের মাথার উকুন নির্মূল করলো। এতে দুই বোনের মাথা শীতল হল।
দুই বোন এবার এদের বিষয়ে জানতে চায়। তখন বৌয়েরা সব খুলে বলে। সব শোনার পর মা প্রকট হন। আসলে ঐ দুই বোন ছিল মা শীতলারই অংশ।
ক্রোধান্বিত মা শীতলা বৌয়েদের ভুলের কথা স্মরণ করায়। বৌয়েরা হাতজোড় করে নিজেদের ভুল স্বীকার করতে থাকে। মায়ের মন, এভাবে ডাকলে আর কি মা রাগ করে থাকতে পারেন? আবার সুস্থ করে দিলেন তাদের সন্তানদের। ছড়িয়ে পড়ল মা শীতলার মাহাত্ম্য।
Courtesy- krishnendu mondal