18/09/2026
||বাঙালি আর অবাঙালি বিশ্বকর্মা||
বিশ্বকর্মা পুজো কেবল ক্যালেন্ডারের একটা পাতা ওল্টানো নয়, এ হলো শরতের আগমনী গান—দুর্গাপুজো যে আর মাত্র কয়েক কদম দূরে, তার প্রথম আনুষ্ঠানিক বার্তা।
কিন্তু আপনি যদি কখনো বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে একটু উত্তর বা পশ্চিম ভারতে পা রাখেন, তবে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য! সেখানে বিশ্বকর্মার যে রূপটি আপনি দেখবেন, তা আমাদের চেনা কার্তিক-মার্কা চনমনে ঠাকুরের থেকে যোজন দূরে।
বাঙালির বিশ্বকর্মা হলেন এক বলিষ্ঠ, নবীন যুবক। কোঁকড়া চুল, চোখে-মুখে পৌরুষের দীপ্তি, ঠোঁটের ওপর নিখুঁত গোঁফের রেখা। তিনি রাজবেশে বসে আছেন এক প্রকান্ড হাতির পিঠে। অথচ বাংলা পেরোলেই তিনি এক প্রাজ্ঞ, শুভ্রকেশী ঋষিতুল্য বৃদ্ধ! দীর্ঘ শ্বেতদাড়ি বুক পর্যন্ত নেমে এসেছে, এক হাতে কমণ্ডলু, অন্য হাতে বেদ আর মাপকাঠি, আর তাঁর বাহন হলো ধ্যানমগ্ন এক রাজহাঁস—ঠিক যেন স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার আরেক রূপ। একই দেবতা, কিন্তু ভূগোল বদলাতেই তাঁর বয়সের এই শতাব্দী-প্রাচীন ফারাক কেন?
এর শিকড় খুঁজতে আমাদের ফিরে যেতে হবে বৈদিক অতীতে। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের বিশ্বকর্মা সূক্তে তিনি হলেন 'সর্বদ্রষ্টা' ও 'সর্বস্রষ্টা'—যাঁর কোনো আকার নেই, তিনি স্বয়ম্ভূ। মানব ইতিহাসের আদিম পর্বে তাঁর কোনো মৃন্ময় প্রতিমা ছিল না। প্রথম যুগে বিশ্বকর্মা পুজো হতো সম্পূর্ণ প্রতীকী উপায়ে। আদি কারিগর, কর্মকার ও সূত্রধর সম্প্রদায় ভাদ্র সংক্রান্তির দিন (কন্যা সংক্রান্তি—যেদিন সূর্য শিল্প ও বুদ্ধির প্রতীক কন্যা রাশিতে প্রবেশ করে) তাঁদের হাতুড়ি, নেহাই, বাটালি ও আগুনকে পুজো করতেন। সামনে রাখা হতো তামার পূত ঘট। শ্রম আর যন্ত্রই ছিল দেবতার মন্দির।
পৌরাণিক আখ্যানে এই নিরাকার শক্তিই রূপ পেলেন দেবশিল্পীরূপে। প্রভাস আর যোগসিদ্ধার পুত্র এই মহান স্থপতি দেবতাদের জন্য তৈরি করলেন স্বর্গপুরী, শিবের ত্রিশূল, বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র, ইন্দ্রের বজ্র আর শ্রীকৃষ্ণের মায়াময় দ্বারকা নগরী। পুরীর জগন্নাথের দারুমূর্তি নির্মাণের পেছনেও লুকিয়ে আছে অনন্ত মহারানা রূপী তাঁরই অলৌকিক হাত।
উত্তর ও পশ্চিম ভারত ধরে রাখল তাঁর এই পৌরাণিক মহাজ্ঞানী 'স্থপতি ঋষি' রূপটিকে—যেখানে রাজহাঁস হলো বিচারবুদ্ধি ও বিশুদ্ধ সৃষ্টির প্রতীক, আর সাদা দাড়ি হলো অনন্ত অভিজ্ঞতার স্মারক।
কিন্তু বাংলায় ছবিটা বদলে গেল উনিশ শতকে। হুগলি নদীর দুই তীরে তখন গজিয়ে উঠছে একের পর এক চটকল, হাওড়ার ঢালাই কারখানা, কলকাতার অজস্র ছাপাখানা আর ট্রাম ডিপো। এই ধূসর, ধোঁয়াটে কারখানার শ্রমিক আর মেকানিকদের প্রয়োজন ছিল এমন এক দেবতার, যিনি ক্লান্তিহীন যৌবনের প্রতীক, যিনি ঘামের মর্যাদা বোঝেন। কুমারটুলির মৃৎশিল্পীরা বাংলার তৎকালীন বাবু সংস্কৃতির রুচি এবং কার্তিকের সুঠাম বীরত্বকে মিলিয়ে বিশ্বকর্মার এক নতুন রূপ গড়লেন। বাহন হিসেবে হাঁসের বদলে নিয়ে এলেন হস্তী বা ঐরাবতকে—যা বিপুল ভারবাহী পেশিশক্তি, ভারোত্তলন ক্ষমতা এবং শিল্পের অবিচল অগ্রগতির চূড়ান্ত প্রতীক।
বাঙালির কাছে বিশ্বকর্মা পুজো কেবল লোহার যন্ত্রপাতিতে সিঁদুর লেপে দেওয়ার আচার নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক তীব্র নস্টালজিয়া। আগের রাতের 'রান্না পুজো' বা অরন্ধন পর্বের পান্তা ভাত আর ইলিশের স্বাদ, পাড়ার গ্যারাজে স্পিকারে হিন্দি গানের ধুমধাম, আর পড়ন্ত বিকেলে এক অদ্ভুত শূন্যতা—যখন সুতো-কাটা ঘুড়ি ভেসে যায় দূর দিগন্তে। বাঙালির বিশ্বকর্মা চিরকালই ঘরের ছেলে, যে শ্রমিকের খসখসে হাতে হাত রেখে নিঃশব্দে বলে যায়: সৃষ্টির চেয়ে বড় কোনো ধর্ম নেই।
@চিত্র-গুপ্ত