06/09/2026
||কেমন ছিল তখনকার নন্দোৎসব?||
ভাদ্রের দুর্যোগপূর্ণ সেই কালরাত্রির মেঘ সবে কাটতে শুরু করেছে। যমুনার উত্তাল জলরাশি তখন শান্ত, আর পুব আকাশে ভোরের আলো ফুটতেই গোকুল যেন এক অলৌকিক সুবাসে জেগে উঠল। বাতাসের প্রতিটা অণুতে তখন পদ্মের ঘ্রাণ, মাটির গভীরে এক অদ্ভুত শিহরণ। ব্রজবাসীরা তখনও জানে না, কংসের অন্ধকার কারাগারকে ফাঁকি দিয়ে বসুদেব রাতের অন্ধকারে কাকে রেখে গেছেন যশোদার বিছানায়। গোকুল শুধু জানল—তাদের বহু প্রতীক্ষিত, বৃদ্ধ নন্দরাজের ঘরে কোল আলো করে এক নীলকান্তমণি এসেছে।
তারপরের কয়েকটা প্রহর? বিশ্বাস করুন, পৃথিবীর কোনো ইতিহাস বা পুরাণে এমন উন্মাদনার দ্বিতীয় কোনো নজির নেই। ভাগবতের দশম স্কন্ধের পঞ্চম অধ্যায় খুললে আজও যেন সেই তিন হাজার বছর আগের ঘি, মাখন আর মাতৃত্বের সুবাস বুক ভরে নেওয়া যায়।
খবরটা যখন ছড়িয়ে পড়ল, তখন গোকুলের মানুষ নিজের অস্তিত্ব ভুলে গিয়েছিল। বৃদ্ধ নন্দরাজ—যাঁর কেশ পেকে সাদা হয়ে গিয়েছিল একটি সন্তানের আশায়—সংবাদ শোনামাত্র কেঁদে ফেললেন। আনন্দের কি কোনো রূপ হয়? নন্দরাজ সেদিন প্রমাণ করেছিলেন, আনন্দ আসলে উজাড় করে দেওয়ার নাম। শাস্ত্র বলছে, পুত্রমুখ দর্শনের পর তিনি স্নান সেরে তক্ষুনি দুই লক্ষ দুগ্ধবতী গাভী দান করলেন। সাধারণ গাভী নয়—যাদের শিং সোনা দিয়ে বাঁধানো, খুরগুলো রূপোর পাতে মোড়া, আর পিঠে মখমলের কারুকাজ করা বস্ত্র। তিল আর রত্নের পাহাড় গড়ে দেওয়া হলো ব্রাহ্মণ ও যাচকবৃন্দের জন্য। গোটা গোকুল যেন মুহূর্তে পরিণত হলো এক মহামিলনমেলায়।
কিন্তু আসল উৎসব তো শুরু হয়েছিল ব্রজের অন্দরমহলে।
খবরটা পৌঁছনো মাত্র ব্রজাঙ্গনাদের ঘরের দোর ছিটকে খুলে গেল। শ্রীমদ্ভাগবত বড় অদ্ভুত এক মানবিক চিত্র এঁকেছে এখানে—গোপললনারা এতটাই আত্মহারা হয়ে পড়েছিলেন যে, সাজগোজের হুঁশটুকুও ছিল না। কেউ এক চোখে কাজল টেনেছেন, অন্য চোখের কথা ভুলেই গেছেন। কারও কেশের বেণী আধখানা বাঁধা, বস্ত্র অবিন্যস্ত, কানের দুল দুলছে বিষম গতিতে—সেই অবস্থাতেই পায়ের নূপুর বাজিয়ে তারা ছুটলেন নন্দভবনের দিকে। তাঁদের হাতে মাঙ্গলিক উপহার—হলুদ, চন্দন, দূর্বাঘাস, নতুন কাপড় আর নিটোল ভক্তি।
নন্দালয়ে তখন সুরের প্লাবন। একদিকে ভেরী, তূর্য, মৃদঙ্গ আর করতাল বাজছে, অন্যদিকে মাগধ ও সূতদের স্তুতিগান। গন্ধতেল আর সুগন্ধি জলে ধুয়ে দেওয়া হচ্ছে গৃহের প্রাঙ্গণ। কিন্তু আনুষ্ঠানিকতা দিয়ে কি আর খাঁটি প্রেমের জোয়ার বাঁধা যায়? নিমেষের মধ্যে সেই শাস্ত্রীয় আচার ভেঙে রূপ নিল এক পাগলপারা বসন্তে।
শুরু হলো ব্রজের সেই আদি ও অকৃত্রিম ‘দধিকাদো’।
আনন্দের আতিশয্যে গোপ আর গোপীরা পাত্রভর্তি দুধ, দই, ঘোল আর হলুদবাটা একে অপরের গায়ে ঢালতে শুরু করলেন। যে মাখনকে ব্রজবাসীরা প্রাণাধিক ভালোবাসতেন, সেই ননী-মাখনের গোলা একে অপরের দিকে ছুঁড়ে মারা হতে লাগল। কাদা, হলুদ আর জমাট বাঁধা দইয়ে নন্দভবনের উঠোন পিছল হয়ে গেল। কেউ আছাড় খাচ্ছেন, আবার খিলখিলিয়ে হেসে উঠে একে অপরকে জড়িয়ে ধরছেন। ধনী-দরিদ্র, ছোট-বড়, নারী-পুরুষের সমস্ত সামাজিক ব্যবধান এক নিমেষে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল ক্ষীর-সাগরের সেই অবিরাম ধারায়। কারও গায়ে মহামূল্যবান সিল্কের কুর্তি, কারও সাধারণ উত্তরীয়—সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল দধি-হরিদ্রার হলুদ বন্যায়।
আর সেই মহোৎসবের কেন্দ্রে?
অন্তঃপুরের নিভৃত কক্ষে এক ক্লান্ত, প্রসবক্লান্তা নারী শুয়ে আছেন—মা যশোদা। তাঁর মুখের দিকে চেয়ে আছেন ব্রজের বয়োবৃদ্ধারা। তাঁদের চোখ সজল। যশোদা হয়তো তখনও জানেন না তাঁর কোলে স্বয়ং ব্রহ্মাণ্ডের অধিপতি খেলা করছেন; তিনি শুধু দেখছেন—তাঁর বহু সাধনার ধন, তাঁর ছোট্ট ‘কানহাইয়া’ চাঁদের মতো হাসি ছড়িয়ে মায়ের আঁচল আঁকড়ে শুয়ে আছে। পুতনা আসবে, শকটাসুর আসবে, কংসের ষড়যন্ত্র ধেয়ে আসবে—এসব ভবিষ্যতের রক্তচক্ষু তখন বহু দূরে। সেই মুহূর্তে ব্রজভূমি কেবল একটি কথাই জানত—“নন্দ ঘরে আনন্দ ভৈলো, জয় কানহাইয়া লাল কী!”
আজকের উৎসব আর সেদিনের নন্দোৎসবের তফাতটা এখানেই। তখনকার উৎসবে কোনো কৃত্রিম আড়ম্বর ছিল না, ছিল না দেখানোর তাগিদ। যা ছিল, তা হলো বুক উপচে পড়া নিখাদ স্নেহ আর আনন্দের এমন এক অকুণ্ঠ বন্যা—যেখানে স্বয়ং ঈশ্বরও ভক্তের ঘরে এসে এক অবোধ শিশু হয়ে ধরা দিয়েছিলেন।