14/03/2026
‘ভাল’ ব্যবহার কি আদৌ আকুপাংচারিস্টের একটি দক্ষতা হিসেবে গণ্য করা প্রয়োজন?
সোমদত্তা মুখার্জী
একজন আকুপাংচারিস্টকে নিঃসন্দেহে অনেকগুলি ক্ষেত্রে দক্ষ হতে হয়। এসবের মধ্যে মানুষের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করাটাও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। যেহেতু এই দক্ষতাটি অর্জন করার সঙ্গে কোনো বিশেষ ধরণের জ্ঞান, কোনো গভীর অধ্যয়ন, প্রাচীন চীনা চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো বিশেষ টেকনিকের সম্পর্ক নেই, তাই আকুপাংচার শিক্ষার্থীরা অনেকেই হয়তো বিষয়টিকে খুব একটা মূল্য দেন না। শুধু আকুপাংচার কেন, ভাল ব্যবহার যেকোনো পেশায় সফলতার অন্যতম কারণ। কিন্তু আকুপাংচারিস্টদের পেশার ক্ষেত্রে এটি বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে কারণ তাদের কাজটাই হল এমন কিছু মানুষকে নিয়ে যারা "কেমন আছ?'-এর উত্তরে “ভাল আছি” – কথাটা অনেকদিন কাউকে বলেননি। হয়ত তারা কোনো অসহ্য ব্যাথায় ভুগছেন, বা তাদের এমন কোনো রোগ হয়েছে যা বহুদিন ধরে পিছু ছাড়ছে না, অথবা মানসিক ভাবে খুব চাপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
অন্যান্য চিকিৎসার মতো আকুপাংচার চিকিৎসারও একটা মানবিক দিক রয়েছে। অন্যান্য ক্ষেত্রে কীভাবে সেই মানবিক দিক ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে অনেক সমালোচনা, বিতর্ক আমরা প্রতিনিয়ত শুনি। অনেকেই আধুনিক চিকিৎসা ক্ষেত্রের মানবিক দিকটি নিয়ে আশা হারাচ্ছেন। কিন্তু সেখানে আমরা আজও এমন কিছু চিকিৎসকদের কথা শুনতে পাই বা দেখতে পাই যারা কোনো রকম আপোষ না করে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চিকিৎসা করে চলেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই একেবারে নিঃশব্দে, প্রচারের আড়ালে কাজ করছেন। প্রচার পেতে তারা যে খুব আগ্রহী, এমনটাও নয়।
যে প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে আকুপাংচার শেখা যায় তাদের একটি গুরুদায়িত্ব হল এই বিষয়টির (আকুপাংচারিস্টের ভাল ব্যবহার) ওপর নজর দেওয়া। আকুপাংচার থিওরি ও প্র্যাকটিকাল শেখানোর পরেও কিছুটা কাজ হয়তো বাকি রয়ে যায়। ট্রেনিং শেষে একজন আকুপাংচারিস্ট প্রতিদিন সরাসরি কাজ করবেন এমন কিছু মানুষের সঙ্গে যারা তাদের স্বাস্থ্য নিয়ে সমস্যায় পড়ে আকুপাংচারিস্টের শরণাপন্ন হবেন। এবং কাজের মধ্যে দিয়ে তাদের সমস্যা সেই আকুপাংচারিস্টকেই জানতে হবে, বুঝতে হবে এবং কীভাবে একজন রোগী-বন্ধুকে চিকিৎসার মাধ্যমে আরাম দেওয়া যায় তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে হবে। সমস্যা শারীরিক হোক বা মানসিক, যারা চিকিৎসা নিতে আসছেন তারা ভাল নেই – এটাই তাদের আসার মূল কারণ। ধরে নেওয়া যাক, তাদের মধ্যে কেউ ব্যাথার উপশম খুঁজতে আসবেন, কেউ উদ্বেগ দূর করতে আসবেন, কেউ বা আসবেন অনিদ্রায় ভুগে অনেক রাত জাগার পর। প্রত্যেককেই আন্তরিক ভাবে সাহায্য করার একটা চেষ্টা চিকিৎসককে করতেই হবে।
ইরিমের (Indian Research Institute for Integrated Medicine (IRIIM) শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা দেখেছি এই প্রতিষ্ঠানে এই বিশেষ দিকটি গড়ে তুলতে যথাসাধ্য চেষ্টা করে চলেছেন ইরিমের চিকিৎসক-শিক্ষকরা। শুধুমাত্র চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রেই নয়, শিক্ষার ক্ষেত্রেও ‘হোলিস্টিক’ বা পূর্ণাঙ্গ কথাটির গুরুত্ব মাথায় রাখা হয়েছে। ইরিম সমন্বিত চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে আকুপাংচারকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে সেই ১৯৮১ সাল থেকে। এই চিকিৎসার মূল ভিত্তি হল, holistic approach towards health and wellbeing। সুস্বাস্থ্য রক্ষার্থে সমন্বিত চিকিৎসা পদ্ধতির সাহায্যে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাই আগামী দিনে রোগী-বন্ধুদের পথ দেখাবে। এই ভাবনা ইরিমের শিক্ষায় আমরা দেখতে পাই। ইরিম পরিচালিত “রণজিৎ মেমোরিয়াল হাসপাতাল এবং আকুপাংচার যোগ-ন্যাচেরোপ্যাথি কলেজ অফ রিসার্চ”-এ প্রবেশ করার পর বিশেষ করে আমাদের যা চোখে পড়ে তা হল হাসপাতালের পরিবেশ এবং তার পাশাপাশি রোগী-বন্ধুদের প্রতি সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি মানুষের ব্যবহার। একজন শিক্ষার্থী যখন সেই পরিবেশে আকুপাংচার শিখছে তখন ইরিমের সামগ্রিক পরিবেশকে উপেক্ষা করা যায় না। এই পরিবেশ আমাদের শিক্ষার ভিতকে আরও মজবুত করেছে। আকুপাংচার চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি চিকিৎসক ও সহযোগীর ব্যবহার থেকে এটাই শিক্ষণীয় যে নিজেদের জীবনের সমস্যার থেকেও বড় রোগী-বন্ধুদের সমস্যা, তাদের কষ্ট।
বর্তমান সময়ের নিরিখে ইরিমে চিকিৎসার খরচ তুলনামূলক ভাবে অনেকটাই কম। অনেকে হয়তো ভাবতেই পারেন না, এই সামান্য ‘ফি’ দিয়ে এই ধরণের উন্নত মানের আকুপাংচার চিকিৎসা কীভাবে সম্ভব! এর পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, একটি আকুপাংচার হাসপাতালে যেখানে প্রতিদিন এতো রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন তারা প্রত্যেকে হাসপাতাল কর্মীদের মানবিক দিকটির সঙ্গেও পরিচিত হচ্ছেন।
হাসপাতালের এই আন্তরিক পরিবেশ সবার সহযোগিতায় তৈরি হয়েছে – চিকিৎসক, কর্মী, রোগী-বন্ধু, এমনকি ওখানকার গাছপালা-পশুপাখিদের অবদানও রয়েছে। এই পরিবেশ রোগী-বন্ধুদের কাছে একটা ভরসার জায়গা। ছোট পরিসরে, একক ভাবেও এমন আন্তরিক পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব শুধুমাত্র মানবিকতার দ্বারা। ধরা যাক, একজন রোগী-বন্ধু একটি সমস্যা নিয়ে আকুপাংচার চিকিৎসা নিতে এসেছেন একটি ক্লিনিকে। তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা মাথায় রেখে, সেই সময়ে তার কথা, তার সুবিধা-অসুবিধাকে গুরুত্ব দিয়ে একমাত্র ভাল ব্যবহারের মাধ্যমে একজন চিকিৎসক সেই মানুষটির কষ্ট কিছুটা লাঘব করতে পারেন। এটাও তার দক্ষতা।
শুধুমাত্র আকুপাংচার কতটা দক্ষতার সঙ্গে শেখানো হয়, তা যেমন এখানকার শিক্ষার্থীরা জানেন, এর সঙ্গে রোগী-বন্ধুদের কতটা আন্তরিকতা ও যত্নের সঙ্গে চিকিৎসা দেওয়া হয়, সেটাও তাদের নজর এড়ায় না। যদিও বা খাতায়-কলমে প্রস্পেক্টাসে এ নিয়ে উল্লেখ থাকে না, কিন্তু প্রতিদিনের চিকিৎসার কাজের সঙ্গে এই শিক্ষা শিক্ষার্থীরা পেয়ে থাকেন। শিক্ষার্থীদের কোর্স চলাকালীন এই মানবিক পাঠ compulsory teaching-এর সরাসরি অংশ না হলেও compulsory learning-এর অংশ হয়েই যায়। এবং পরবর্তীকালে অনেকেই হয়তো জীবনের নানান সময়ে নিজেদের আকুপাংচার পেশার ক্ষেত্রে বা তার বাইরেও এই মানবিক পাঠকে কাজে লাগিয়ে থাকেন। এই পাঠ শুধু আকুপাংচারিস্ট তৈরি করে না, একটি আকুপাংচারিস্টের জীবনবোধও তৈরি করে। অন্তত সেই সম্ভাবনা তৈরি করে প্রতিটি শিক্ষার্থীর মধ্যে।
একজন আকুপাংচারিস্টকে সফল হতে গেলে চিকিৎসা সংক্রান্ত দক্ষতা অর্জন করতেই হবে। পেশায় সেই সব দক্ষতা কাজে লাগিয়ে অনেক দূর এগোনো সম্ভব। কিন্তু, সেই দক্ষতাই সব নয়। চিকিৎসার দক্ষতা যদিও বা কেউ অর্জন করতে সক্ষম হয়, তাহলেও মনে করার কোনো কারণ নেই, মানবিক দিকটির আর গুরুত্ব রইল না। আকুপাংচার ম্যাজিক নয়, আকুপাংচারিস্টও ম্যাজিসিয়ান নন। মাটিতে পা রেখে মানুষের সঙ্গে তাকে কাজ করতে হবে, মানুষের কাছে তাকে পৌঁছাতে হবে, সেটা তার পেশার জন্যেই করতে হবে, এছাড়া গতি নেই। মানুষের আজও অনেক ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে এই চিকিৎসা নিয়ে, সূচের মাধ্যমে চিকিৎসা করার ভয় অনেকের মধ্যে রয়েছে। অনেকেই কিছু না জেনে এই চিকিৎসা নিতে আসেন, হয়তো কারোর কাছে শুনেছেন এভাবেও চিকিৎসা হয়, ব্যথা কমে। আবার আজকের দিনে অনেকেই সচেতন রোগী-বন্ধুদেরও সান্নিন্ধ্য পান। দুই ক্ষেত্রেই যা হবে তা রোগীবন্ধুর শরীর-মনে হবে, অর্থাৎ, সূচ দিয়ে চিকিৎসা এবং উপশম – দুইই হবে রোগী-বন্ধুর শরীর-মনে। দুই ক্ষেত্রেই আকুপাংচারিস্টের ভাল ব্যবহার বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি তাদের আস্থা অর্জন করে চিকিৎসা করবেন, বা অন্যান্য পরামর্শ দেবেন, যদি রোগী-বন্ধুর কষ্ট লাঘব করা তাঁর মূল লক্ষ্য হয়।
Photo: WHO Archive