19/02/2021
হৃদয়ের অত্যাচার।
________________
একদিন পরমহংসদেব জ্বরগ্রস্ত হয়ে শুয়ে আছেন, এমন সময় কোন ভক্ত একটি ফুলকপি নিয়ে এল এবং তাঁর কাছে রাখাতে ঠাকুর আহ্লাদে উঠে বসলেন ও কপিটার খুব প্রশংসা করে বললেন “দেখ, তােমরা ঐ ঘরের মধ্যে ইহা লুকাইয়া রাখিয়া আইস।
হৃদয়কে বলিও না যে, আমি ইহা দেখিয়াছি, তাহা হইলে আমায় বড় গালাগালি দিবে!” আজ্ঞা করা মাত্র কপিটাকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হল। পরমহংসদেব বলতে লাগলেন, “দেখ, হৃদে আমার যে সেবা করিয়াছে, তাহা আমি কখনই ভুলিব না। হয়তাে মা কালীর ইচ্ছায় সে না থাকিলে আমার দেহ এতদিন থাকিত না। আমি যখন পঞ্চবটীতে ধ্যান করিতাম, হৃদে আমার পশ্চাতে যাইয়া ভয় দেখাইবার জন্য ইট মারিত। কিয়ৎকাল পরে আপনি চলিয়া আসিত। একদিন সে সাহসে ভর করিয়া পঞ্চবটীর মধ্যে প্রবেশ করে। সিদ্ধভূমি পঞ্চবটী, তথায় যাইবামাত্র আমি বলিলাম 'কে ও হৃদে' ?" হৃদে বলিল, “মামা, তুমি একলা বসিয়া কি করিতেছ?” "আমি তাহাকে তথায় বসিয়া ধ্যান করিতে বলিলাম। হৃদে উপবেশন করিবামাত্র ‘মামা গাে! আমার পিঠে কে আগুন ঢালিয়া দিল’ বলিয়া চিৎকার করিয়া উঠিল। আমি তাহার পৃষ্ঠে হস্তাৰ্পণ করিয়া ‘ভয় নাই’ বলায়, সে চুপ করিল। সেই মুহূর্ত হইতে কেমন মা কালীর ইচ্ছা, হৃদয়ের ভাবান্তর হইয়া গেল। যেন পাঁচ বােতল মদের নেশা আসিয়া উপস্থিত হইল ও আনন্দে বিভাের হইয়া পড়িল। পরদিন রাত্রে আমি বহির্দেশে গিয়াছি, হৃদে আমার পশ্চাৎ চলিয়া আসিয়া উচ্চৈঃস্বরে, চিৎকার করিয়া বলিতে লাগিল, 'ওরে রামকৃষ্ণ, তুইও যে, আমিও সে, তােতে আমাতে প্রভেদ কি? চল, আমরা আর এখানে থাকিব না।' আমি তাড়াতাড়ি উহার নিকটে আসিয়া বলিলাম, “চুপ চুপ! এখনই সকলে জানিতে পারিবে। আমাদের এখানে
থাকা ভার হইবে। ওরে, আমরা কি হইয়াছি ? চুপ কর। হৃদে কিছুতেই শুনিল না, উত্তরােত্তর চিৎকার বাড়াইল। আমি তখন উপায় না দেখিয়া তাহাকে বলিলাম, এককণা শক্তিধারণ করিতে পারিলি না, তবে আর কি হইবে, জড়বৎ হইয়া যা। অমনি হৃদে ভূমিতে পতিত হইয়া বলিল,
‘মামা, কি সর্বনাশ করিলে! আমি আর অমন করিব না'।" তারপর থেকে হৃদয় বাস্তবিকই জড়বৎ হয়ে গেল। তিনি বলতে লাগলেন, "হৃদে যেমন আমার সেবা করিয়াছে, মা কালী উহার আশাতীত ফলও দিয়াছেন।
দেশে বিলক্ষণ জমি-জমা করিয়াছে, লােককে টাকা ধার দেয়, এই মন্দিরে
কর্তার ন্যায় হইয়া রহিয়াছে এবং এত লােকে উহার সম্মান করিয়া থাকে।”
এইসব কথা বলার সময় হৃদয় সেখানে এসে উপস্থিত হল। তিনি আসা মাত্র পরমহংসদেব তাকে সম্বােধন করে বললেন, “দেখ, আমি ইহাদের কপি আনিতে বলি নাই, উহারা আপনারা আনিয়াছে, মাইরি বলিতেছি, আমি উহাদের কিছুই বলি নাই।” হৃদয় এই কথা শুনে ঠাকুরকে তিরস্কার করলেন। তার সে মূর্তি মনে হলে এখনও আমাদের হৃৎকম্প উপস্থিত হয়! পরমহংসদেব সরােদনে মা কালীকে লক্ষ্য করে বলতে লাগলেন, “মা, তুই আমার সংসারবন্ধন কাটিয়া দিলি, পিতা গেল, মাতা গেল, ভাই গেল, স্ত্রী গেল, জাতি গেল —শেষে কি না হৃদয়ের হাতে আমার এই দুর্গতি হইতে লাগিল!” এই কথা বলে তিনি পুনরায় হাসতে হাসতে বলতে লাগলেন, “ও আমায় বড় ভালবাসে, ভালবাসে বলিয়াই বকে, ছেলেমানুষ, উহার বােধ হয় নাই। উহার কথায় কি রাগ করিতে হয়, মা ?” এই বলতে বলতে সমাধিস্থ হয়ে পড়লেন।
কিন্তু হৃদয়ের রাগ মিটল না। ঠাকুর ক্রমশ: হৃদয়ের অত্যাচারে নিতান্ত কাতর হয়ে উঠলেন। হৃদয় সেসময় সকলেরই মর্যাদা হানি করতে আরম্ভ করেছিল। ঠাকুরবাড়ির প্রত্যেক কর্মচারী তার জন্য উৎপীড়িত ও মর্মাহত হয়ে থাকত। পরমহংসদেব বার বার নিষেধ করতেন। হৃদয় নিষেধে কান না দিয়ে গর্বের সাথে বলেছিল, “রাসমণির অন্ন ব্যতীত তােমার গতি নাই। তুমি সকলকে ভয় করিবে, আমি কাহাকে গ্রাহ্য করি ? না হয় চলিয়া যাইব।” গরিব ব্রাহ্মণ, জগদম্বার কৃপায় পাঁচজনের পূজনীয় হয়ে সম্মানের সাথে বাস করছিলেন, কিন্তু অদৃষ্টের দোষে তা হৃদয় বুঝতে পারল না। তার বিপদের মূহুর্ত এগিয়ে এল।
কালীমন্দির প্রতিষ্ঠার বাৎসরিক উৎসবের দিনে সেখানে খুব ধুমধাম হত সেজন্য সেদিন ত্রৈলােক্যবাবু সপরিবারে সেখানে এসেছিলেন। উৎসবের দিন সকালে হৃদয় পূজা করতে যেত। ওখানে ত্রৈলােক্যবাবুর একটা দশ বছরের বিবাহিতা কন্যা তসরের শুদ্ধবস্ত্র পরে দাঁড়িয়ে ছিল। হৃদয় সেই বালিকাটির চরণে পুস্পাঞ্জলি দেয়। এর আগে পরমহংসদেব ঐ প্রকার পূজা করতেন। হৃদয় তা অনুকরণ করতে গিয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনল। কন্যার পায়ে চন্দনের চিহ্ন দেখে তার মা জিজ্ঞাসা করায় হৃদয়ের কাণ্ডকারখানা প্রকাশ হয়ে যায়। ত্রৈলােক্যবাবুর স্ত্রী কন্যার অকল্যাণ হবে ভেবে কাঁদতে লাগলেন। তাই দেখে ত্রৈলােক্যবাবু ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন এবং দারোয়ান দিয়ে একবস্ত্রে হৃদয়কে মন্দির থেকে বহিষ্কার করে দিলেন এবং সেই ক্রোধে
পরমহংসদেবকেও নাকি চলে যাবার জন্য আদেশ দিয়েছিলেন।
দ্বারবান এই সংবাদ নিয়ে পরমহংসদেবের কাছে উপস্থিত হল। তিনি হেসে বললেন, “তােমার বাবুর আমি কি করিলাম?” এই বলে তিনি সেই অবস্থায় মন্দির থেকে বের হয়ে একমনে চলতে লাগলেন।
পরমহংসদেব যখন বাবুদের বৈঠকখানার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন কে জানে কি কারণে ত্রৈলােক্যবাবু জিজ্ঞেস করেন, “আপনি কোথায় যাইতেছেন?” এই কথা
বলায়, পরমহংসদেব অমনি ফিরলেন এবং তাদের কাছে গিয়ে বসলেন।
ত্রৈলােক্যবাবু, হৃদয়ের সম্বন্ধে নানা কথা বললেন এবং কন্যাটির অকল্যাণের
আশঙ্কায় ভীত হয়ে হৃদয়কে মন্দির ত্যাগ করতে বলেন।
ঠাকুর তাঁকে অভয় দিয়ে পুনরায় নিজ ঘরে ফিরে এলেন।
হৃদয় যদু মল্লিকের উদ্যানে বাস করতে লাগলেন। রামকৃষ্ণদেব দুই বেলা তাঁর নিজের অংশ থেকে অন্নব্যঞ্জন ও মিষ্টান্নাদি পাঠিয়ে দিতেন এবং নিজে তাকে দেখে আসতেন। হৃদয় এই সময়ে পরমহংসদেবকে
মন্দির থেকে চলে আসবার জন্য অনুরােধ করে ও নানারকম যুক্তি দিয়ে বলে যে ,কোন স্থানে গিয়ে একটা কালীমূর্তি স্থাপন করে উভয়ে সুখে বাস করবেন। পরমহংসদেব এই কথা শুনে বলেছিলেন, “তুই কি আমায় লইয়া দ্বারে দ্বারে ফিরি করিয়া বেড়াইবি ?”.......
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জীবনবৃত্তান্ত,লেখক রামচন্দ্র দত্ত- থেকে সংগৃহীত।
প্রণাম নিও ঠাকুর।