12/08/2026
৯ ই আগস্ট, সারা রাজ্য যখন আর জি কর হাসপাতালের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ২ বছরের বিচারহীনতায় পথে, ঠিক অন্য দিকে, মালদা জেলার রতুয়া গ্রামীণ হাসপাতালে যে ভয়াবহ ও বর্বরোচিত সংঘবদ্ধ হামলা চালানো হলো, তা রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলির কঙ্কালসার নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে ফের উন্মোচিত করেছে।
মাত্র ৩০ টি শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন ক্ষমতার দুই থেকে তিন গুণ ইনডোর রোগীর চাপ সামলাতে হয়। আউটডোর, ইমার্জেন্সি, ইনডোর ও লেবার রুম—সব বিভাগে পরিষেবা চালু থাকলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও পরিকাঠামোর চরম ঘাটতি রয়েছে। সেই চরম প্রতিকূলতার মধ্যেই জীবন বাজি রেখে কর্মরতের ওপর নেমে আসে হিংস্র হামলা। আক্রান্ত চিকিৎসকরা সময়মতো ঘটনাস্থল থেকে সরে যেতে না পারলে প্রাণহানি পর্যন্ত ঘটতে পারত। ঘটনার পর কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের দাবি করা হলেও এফআইআর-এর স্পষ্ট বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি, এমনকি পুলিশি হস্তক্ষেপের পরও হাসপাতালে স্থায়ী নিরাপত্তার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এত বড় আতঙ্ক ও প্রাণের ঝুঁকির মধ্যেও আমাদের সহযোদ্ধারা পরিষেবা স্তব্ধ করেননি—জীবনের তোয়াক্কা না করে চিকিৎসা চালিয়ে গেছেন। কিন্তু প্রতিনিয়ত রক্ত ঝরিয়ে পরিষেবা দেওয়া সম্ভব নয়।
আমাদের জরুরি ও সর্বসম্মত দাবিসমূহ:
১. স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি ও ২৪ ঘণ্টার নিরাপত্তা বলয়:
• হাসপাতালের প্রধান প্রবেশপথ বা জরুরি বিভাগের নিকটবর্তী দৃশ্যমান স্থানে অবিলম্বে একটি স্থায়ী Police Outpost (পুলিশ ফাঁড়ি) স্থাপন করতে হবে।
• সেখানে ২ জন সশস্ত্র (armed) পুলিশ ও ২ জন সিভিক ভলান্টিয়ার ২৪ ঘণ্টা উপস্থিত থাকবেন।
• একজন রোগীর সাথে সর্বাধিক ২ জন পরিদর্শকের (visitor/attendant) প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব থাকবে এই বাহিনীর ওপর। অনুমতি মিললেই কেবল প্রবেশ সম্ভব হবে।
• সার্বক্ষণিক প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মী ও পুলিশি নজরদারির মাধ্যমে হাসপাতালের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে।
২.সীমানা প্রাচীর নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রিত প্রবেশপথ:
• হাসপাতাল চত্বরের সম্পূর্ণ পরিধি ঘিরে উপযুক্ত উচ্চতার boundary wall বা নিরাপত্তা প্রাচীর নির্মাণ এবং বিদ্যমান জীর্ণ প্রাচীর অবিলম্বে মেরামত করতে হবে।
• সুনির্দিষ্ট প্রবেশ ও প্রস্থান পথ তৈরি করে সেখানে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন রাখতে হবে।
৩.জরুরি সুরক্ষা প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত সংস্কার:
• জরুরি বিভাগে অন্তত ৪টি বেডের সুব্যবস্থা করে ইমার্জেন্সি সম্প্রসারণ করতে হবে, যাতে তাৎক্ষণিক ভর্তি বা রেফার করার আগে প্রয়োজনীয় clinical observation রাখা যায়।
• সেখানে কাজ করার পরিবেশ উন্নত করতে এসি ও অতিরিক্ত ফ্যানের ব্যবস্থা করতে হবে।
• পুরো হাসপাতালে প্যানিক অ্যালার্ম, সিসিটিভি নজরদারি এবং দ্রুত সাড়া প্রদানকারী ‘অ্যান্টি-ভায়োলেন্স রেসপন্স সিস্টেম’ চালু করতে হবে।
৪.রোগীর পরিজন নিয়ন্ত্রণ ও পাস ব্যবস্থা:
• ওয়ার্ড ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ বন্ধ করতে visitor pass বা attendant identification ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৫.আউটডোর ও চিকিৎসকদের কক্ষের নিরাপত্তা:
• Duty/On-duty doctors' room-এর বাইরে সার্বক্ষণিক সিভিক ভলান্টিয়ার বা নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করতে হবে, যাতে অননুমোদিত প্রবেশ, অনভিপ্রেত চাপ বা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দেওয়া যায়।
• আউটডোরের দীর্ঘ লাইন সামলানো এবং বিশৃঙ্খলা এড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত কর্মীবাহিনী নিযুক্ত করতে হবে।
৬.দৃষ্টান্তমূলক আইনি শাস্তি:
• হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা ও মেডিকেয়ার সুরক্ষা আইন অনুযায়ী দ্রুত কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
৭.পরিকাঠামো ও চিকিৎসক বৃদ্ধি:
• শূন্যপদ পূরণ করে রোগীর বিপুল চাপ অনুযায়ী অবিলম্বে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করতে হবে।
প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার যেমন রয়েছে, চিকিৎসকদেরও নিরাপদ পরিবেশে কাজ করার মৌলিক অধিকার রয়েছে। 'অভয়া' হত্যার পর টাস্ক ফোর্সের সুপারিশ আজও কাগজে-কলমে বন্দী। আর কত রক্তপাতের পর প্রশাসন জাগবে?
West Bengal Junior Doctors' Front স্পষ্ট ভাষায় জানাচ্ছে, নিরাপত্তা কোনো অনুগ্রহ নয়, নিরাপদ স্বাস্থ্যব্যবস্থার অপরিহার্য শর্ত।
হাসপাতালে হিংসার বিরুদ্ধে ZERO TOLERANCEএখনই নিশ্চিত করতে হবে!