26/03/2026
প্রসঙ্গঃ সুইডেনে উচ্চশিক্ষা- ২য় পর্ব
Admission:
উচ্চশিক্ষার গুণগত মান ও আন্তর্জাতিক গ্রহনযোগ্যতার বিচারে সুইডেনের উচ্চশিক্ষা আসলেই অনেকেই স্বপ্নের গন্তব্য। এখানে মূলত সুইডেনে সেকেন্ড সাইকেল এডুকেশন বা মাস্টার্স ডিগ্রী নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
এ বছর যারা পড়তে আসছেন তারা আজ সুইডেনের কেন্দ্রীয় এডমিশন সিস্টেম (universityadmission [dot] se) থেকে ভর্তির ফলাফল পেয়েছেন।
ফলাফলটা সাধারনত এভাবে আসে-
১) যাদের প্রথম চয়েজের সাবজেক্ট পেয়ে যান তাদের ক্ষেত্রে আসে Conditionally Admitted. এই Conditionally ব্যাপারটা এদের একটা সাধারন টার্ম। আপনার এডমিশন লেটারে যদি কোন স্পষ্ট শর্ত, যেমন আইইএলটিএস, বা কোন ডকুমেন্ট দেওয়ার কথা না থাকে তাহলে বুঝে নেবেন, এটাই চুড়ান্ত। Condition হল টিউশন ফিস জমাদান ও ভিসা পাওয়া। দুটোই আপনার দায়িত্ব। এই দুটো সম্পন্ন করে চলে আসবেন সোজা ক্লাসে।
যারা প্রথম চয়েজে পাবেন, তাদের ক্ষেত্রে বাকি ৩ টা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিলিটেড হয়ে যাবে। এটাই নিয়ম, সুইডেনে দ্বৈত এডমিশন সম্ভব না।
২) যারা প্রথম চয়েজে পাবেন নিশ্চিতভাবে না, তারা এক বা একাধিক সাবজেক্টে ওয়েটিং এ থাকবেন তাদের ক্ষেত্রে Reserved লেখা আসবে এবং তারপর একটা ওয়েটিং সিরিয়াল দেবে। কোর্সে ছাত্র সংখ্যার আনুমানিক এক তৃতীয়াংশ ফান্ড ম্যানেজের জটিলতায় নাও আসতে পারে, অতএব সিরিয়াল তেমন থাকলে সম্ভাবনা আছে।
অভিনন্দন।
Fund:
এখন আপনার মূল কাজ হল ফান্ড যোগাড় করা। ফান্ডের উৎস- ১) সুইডিশ ইন্সটিউট স্কলারশিপ ২) বিশ্ববিদ্যালয় স্কলারশিপ ৩) দেশীয় স্কলারশিপ ৪) নিজস্ব ফান্ড
১) সুইডিশ ইন্সটিউট স্কলারশিপঃ
si [dot]se এর মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। এ বছরের আবেদন ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। যারা করেছেন শুভকামনা, যারা করেননি, বিকল্প ভাবুন। যারা আগামীতে করবেন, তারা এখন থেকে তথ্য যোগাড় করে প্রস্তুতি শুরু করুন।
২) বিশ্ববিদ্যালয় স্কলারশিপঃ
যে বিশ্ববিদ্যালয়ে এডমিশন অফার পেয়েছেন, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে খোঁজ করুন। যতদুর জানি ইতোমধ্যে আবেদনের সময় শেষ। এগুলো সাধারনত ভর্তির আবেদনের সাথে সাথে একই সময়ে বা কাছাকাছি সময়ে করতে হয়।
৩) দেশীয় স্কলারশিপঃ
আপনি যে দেশের নাগরিক, সেই দেশের সরকার ও ভিবিন্ন সংস্থার কিছু বৃত্তি থাকে। বাংলাদেশে যেমন সরকারী কর্মকর্তাদের জন্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য বা স্বায়ত্ব-শাসিত সংস্থার কর্মীদের জন্য তাদের নিজস্ব কিছু বৃত্তির ব্যবস্থা থাকে। সেগুলো খোঁজ করতে পারেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রনালয়ের অধীনেও একটি বৃত্তি আছে।
২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী স্কলারশিপ নামে একটি বৃত্তি ছিল, যেখানে সরকারী বেসরকারী সকলেই আবেদন করতে পারতেন এবং হায়ার র্যাঙ্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেলে ও পরীক্ষা/ভাইভাতে ভালো করলে সাধারনত পূর্ণবৃত্তি পাওয়া যেতো। জানামতে সেটি বন্ধ। দেখা যাক, চালু হয় কিনা। এছাড়া বর্তমান সরকার শিক্ষা ঋনের ব্যাপারেও কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিচ্ছেন বলে গণমাধ্যমে জেনেছি, সেগুলোও খোঁজ খবর রাখুন।
৪) নিজস্ব ফান্ডঃ
এটি তো বুঝতেই পারছেন, নিজের টাকা।
ফান্ড সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতাঃ
১) সুইডেনে প্রফেসরস ফান্ড/টিএ/আরএ বলে কিছু নেই! অতএব কেউ ব্যক্তিপর্যায়ে আপনাকে এরকম কিছু দিতে পারবে না। টিএ/আরএ পেতে পারেন আসার পর শিক্ষাকালীন সময়ে পার্ট-টাইম জব হিসেবে। সেটিও খুব ব্যতিক্রম উদাহরন।
২) পূর্ণ স্কলারশিপ আবার ২ ধরনের, স্টাইপেন্ড সহ/ছাড়া। অর্থাৎ জীবন চলার খরচ কে দেবে? ১ ও ৩ এ উল্লেখিত স্কলারশিপ স্টাইপেন্ড সহই হয়, ২ এর ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে নেবেন।
Visa:
সুইডেনের কেন্দ্রীয় এডমিশন সিস্টেম (universityadmission [dot] se) থেকে ভর্তির ফলাফল দিয়েছে, ওদের কাজ শেষ। ওটাই অফার লেটার। এখন ভিসার আপনাকেই করতে হবে। ভিসার সকল তথ্য migrationsverket [dot] se তে পাবেন।
এখানে যে তথ্য নেই, সে তথ্য যেই দিক, তার কোন দাম নেই- লিখে রাখুন। আর এখানে যে তথ্য বা সিদ্ধান্ত আছে তা রদ বা পরিবর্তন করবার ক্ষমতা কারও নেই- এটাও লিখে রাখুন।
সুইডেনের আইনের ফাঁকফোকর খুবই কম, যদিও থাকে আর আপনি কোন প্রকার ফাকি দিয়ে ঢুকে পড়েন, নিশ্চিত থাকুন ধরা পড়বেন, এবং ধরা পড়ার পর ভিসা ক্যান্সেল!
সে আপনার স্ট্যাডির মাঝপথে হোক আর শেষ পথে হোক, তা কেউ দেখবে না। তাই নিজের সম্পর্কে গুছিয়ে লিখুন, সুন্দর করে লিখুন, কিন্তু এক বর্ন মিথ্যা লিখবেন না। বিশেষ করে প্রতারক এজেন্সির পাল্লায় পড়ে নিজের মহা-সর্বনাশ করবেন না।
এবছরও ছোট ছোট কারনে কারও কারও ভিসা মাঝপথে বাতিল করে দিয়েছে!
Spouse:
নিয়ম অনুযায়ী সুইডেনে পড়তে যাওয়া ছাত্রছাত্রীদের স্ত্রী/স্বামী/ নিবন্ধিত পার্টনার ও তাদের নির্ভরশীল সন্তান তার সাথে যেতে পারে। কিন্তু তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ভার আলাদাভাবে নিয়ে যেতে হবে। শুধু দেখালেই হবে না, সেই টাকা যে সুইডেনে নিয়ে গেছেন বা খরচ করছেন তার প্রমানও চাইতে পারে।
আর হ্যাঁ, ২০২৪ সাল পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রী ও তার স্ত্রী/স্বামী/ নিবন্ধিত পার্টনার ও তাদের নির্ভরশীল সন্তান তার সাথে একসাথে যেতে পারতেন, ২০২৫ থেকে পারেন না। ছাত্র-ছাত্রী আগে ভিসা পায়, বাকিরা ৩ মাস বা তার পরে পায়। সামান্য ত্রুটিতে পায় না, এমন উদাহরণ দিন দিন বাড়ছে, অতএব ভালোভাবে বুঝেশুনে আবেদন করবেন।
Life in Sweden:
সুইডেন দেশটি অসম্ভব সুন্দর। অবিশ্বাস্য রকম সাজানো-গোছানো, নিয়মতান্ত্রিক আর শান্ত! বিশ্বাস করবেন না, এই শান্ত-ভাবই একসময় বিরক্ত লাগবে। আর এদেশ আইনের শাসনে চলা দেশ। কেউ আইন মানতে বলবে না, তবুও দেখবেন সবাই আইন মেনে চলছে, আপনিও চলবেন। একচুল এদিক সেদিক হলে দেখবেন, বাড়িতে চিঠি চলে এসেছে- মোটা জরিমানা, ক্ষেত্র বিশেষে উপযুক্ত শাস্তি! যেমন, ভিসা বাতিল করে বাড়ি! তবে সেটি কেবল গুরুতর অপরাধের (ক্রিমিনাল অফেন্স) জন্য।
এখানে সবই সিস্টেমে চলে, ডিজিটালাইজেশনের আদর্শ পাঠ্যপুস্তক উদাহরণ যেন এই দেশ! আসুন, অসাধারণ অভিজ্ঞতা হবে নিশ্চয়।
সুইডেনে থাকতে হলে আপনাকে দুটো জিনিস অবশ্যই লাগবে-
১) পার্সোনাল নাম্বার (যারা ১৩ মাসের বেশি সময়ের জন্য আসবেন তারা পাবেন, যারা পাবেন না, তাদের জন্য বিকল্পের নাম কো-অর্ডিনেশন নাম্বার)
২) ব্যাঙ্ক আইডি ( যদিও মনে হচ্ছে ব্যাঙ্ক একাউন্ট, আসলেও তাই। কিন্তু এর গুরুত্ব এখানে আসলে টের পাবেন)
Accommodation:
এবার আসা যাক এসে থাকবেন কোথায়?
প্রায় সব শহরেই স্টুডেন্ট হাউসিং আছে। সেখানে বাসা পাওয়া তুলনামুলক ভাবে সহজ ও টাকাও কম লাগে। বলে রাখা ভালো, সুইডেনে আপনার নিজের একটা ঠিকানা থাকা বাধ্যতামূলক।
যদি আসার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে আগেই সংশ্লিষ্ট শহরের স্টুডেন্ট হাউসিং এর একাউন্ট খুলে পয়েন্ট জমান। সেই পয়েন্টের ভিত্তিতে বাসা পাবেন। স্টকহোল্মে যেমন sssb[dot] se
দেশে থেকে সর্বোচ্চ ৯০ পয়েন্ট জমাতে পারবেন, ১ দিন মানে ১ পয়েন্ট। এর এক দিন বেশি হলেও সব পয়েন্ট কাটা, তাই ৯০ দিনের মাথায় পার্ক করে রাখবেন। বাকিটা এখানে এসে স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সদস্যপদ পাওয়ার পর।
আসার আগেই sssb[dot] se এর বাসা না পান, সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের হাউজিং এ উঠবেন বা অন্যান্য হাউসিং কোম্পানীর মাধ্যমেও চেষ্টা করতে পারেন বা খুব বিশ্বস্ত ও পরিচিত কারও মাধ্যমে সাময়িক বাসা নেবেন। সতর্ক থাকবেন, নামে বেনামে অনেক ফ্রড আছে এখানেও।
Food:
স্টকহোল্মে হলে চিন্তা নেই, অন্য শহরের খবর জানিনা।
বছর ঘুরতে গেলো, এখনো দেশী ছাড়া কিছু খাইনি। দেশী খাবার একটু দাম বেশি, আর অত তরতাজা পাবেন না, তবে মন্দ না। মাছ পাবেন বেশ, মাংস বেশ সস্তা, দামি হল সবজী। মনমত মশলা নিয়ে আসবেন।
Cost:
খরচের হিসাব জনে জনে ভিন্ন। তবে বাসা ভাড়াটাই আসলে বেশি, খাবার খরচ সহনীয়। যাতায়াত ভাড়াও বেশ, তবে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য অনেক ছাড়! প্রায় অর্ধেক!
অঢেল টাকার মালিক ও ওড়ানোর ইচ্ছে না থাকলে নবাবী করবেন না। এদেশে নবাবীকে কেউ পাত্তা দেয় না, উল্টো নবাবী করতে দেখলে মস্তিষ্কের উন্নতির দশা নিয়ে পিছনে হাসাহাসি করে।
সুইডেন সাসটেইনএবিলিটির জন্য বিখ্যাত- এখানে পুরনো জিনিসের খুব কদর। এখানে অল্প দামে অসাধারণ সব পুরনো জিনিস পাওয়া যায়। আপনি নাক শিটকালেও এদেশের নামীদামী অধ্যাপক-বিজ্ঞানী-ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার তা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে কেনে!
আর এখানে বিভিন্ন গ্রুপ আছে, যেখানে বিনামূল্যে জিনিস দিয়ে দেয়, ফকিরের ভিক্ষা বা দয়ার দানের মত করে না, উপহারের মত করে দেয়- এটাই এখানকার সংষ্কৃতি! তাছাড়া স্টুডেন্ট হাউসিং গুলোতে, চার্চে, বিশ্ববিদ্যালয়ে কাপড়চোপড় ও ব্যবহার্য জিনিসের আদানপ্রদানের অনুষ্ঠানও হয়, বেশ ঘটা করে!
অতএব, যদি নবাবী না করতে চান, আটপৌরে চলার অনেক ব্যবস্থা এখানে আছে।
তবে নবাবী করতে চাইলেও অনেক ব্যবস্থা আছে, দূর থেকে দেখেছি, বিস্তারিত জানি না। আমি আটপৌরে বঙ্গসন্তান কিনা।
আপাতত এটুকুই, বাকিটা আপনাদের প্রশ্নের ভিত্তিতে লিখবো।
আবারও অভিনন্দন ও শুভকামনা